ওমিক্রন ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

0
116

স্টাফ রিপোর্টার :

করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে ভারত। বাংলাদেশ ছাড়াও ইউরোপ ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ভারতের এই তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে বলে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্টের ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকা করেছে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দেশটির সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই তালিকায় ঠাঁই পাওয়া দেশগুলো থেকে দর্শনার্থীদের ভারতে যাওয়ার পর সেখানে নিজ খরচে আরটি-পিসিআর পরীক্ষাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা মেনে চলতে হবে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সোমবার এই তালিকা হালনাগাদ করেছে। বাংলাদেশ ছাড়াও এই তালিকায় আছে ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, বতসোয়ানা, চীন, মৌরিশাস, নিউজিল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, সিঙ্গাপুর, হংকং, ইসরায়েল। ভারতের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, তালিকার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো থেকে আগত আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সেখানে পৌঁছানোর পর নিজ খরচে করোনার আরটি-পিসিআর পরীক্ষা করাতে হবে। পরীক্ষায় নেগেটিভ হলে কোয়ারেন্টাইন এবং পজিটিভ হলে কঠোর আইসোলেশনের নিয়ম পালন করতে হবে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারতে পৌঁছানোর পর যাত্রীদের অবশ্যই নিজ খরচে কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য নমুনা জমা দিতে হবে। এরপর ভারত ছেড়ে যাওয়া অথবা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংযোগকারী বিমানের ফ্লাইট ধরার জন্য করোনা পরীক্ষার ফলাফল না পাওয়া পর্যন্ত বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে হবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া বলছে, পরীক্ষায় করোনা নেগেটিভ হলে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের সাতদিনের হোম কোয়ারেন্টাইন পালন করতে হবে। ভারতে পৌঁছানোর অষ্টম দিনের মাথায় আবারও করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। এই পরীক্ষায় নেগেটিভ ফল এলে পরবর্তী সাতদিন যাত্রীদের স্বেচ্ছা স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে। এই ধরনের যাত্রীরা পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ শনাক্ত হলে, সেটি ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট কি-না তা জানার জন্য তাদের নমুনা জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। এই সময় তাদের পৃথক আইসোলেশন স্থাপনায় রাখা হবে এবং স্টান্ডার্ড প্রোটোকল অনুযায়ী তাদের চিকিৎসা এবং কন্টাক্ট ট্রেসিং করবে কর্তৃপক্ষ। করোনা পজিটিভ যাত্রীদের সংস্পর্শে আসা লোকজনকেও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন অথবা হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা হবে। সে সময় রাজ্য সরকারের করোনা প্রোটোকল অনুযায়ী, করোনা পজিটিভ রোগীদের কঠোর কোয়ারেন্টাইন বিধি মেনে চলতে হবে। আগের সব ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় সম্ভাব্য অতি-সংক্রামক ওমিক্রন গত বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর থেকে এই ভ্যারিয়েন্ট অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা, ব্রিটেন, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, হংকং, ইসরায়েল, ইতালি, নেদারল্যান্ডস এবং স্কটল্যান্ডে শনাক্ত হয়েছে। ওমিক্রনকে ‘উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্ট’ হিসেবে তালিকাভূক্ত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, ‘এই ভ্যারিয়েন্টের তীব্রতার মাত্রা বোঝার জন্য কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে।’ বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেওয়া করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে শনাক্ত হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১৫ নির্দেশনা : প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের নতুন ধরন ওমিক্রনের বিস্তার ঠেকাতে কয়েকটি দেশ থেকে আসা যাত্রীদের স্ক্রিনিং, জনসমাগম নিরুৎসাহিত করা এবং পর্যটন, বিনোদন কেন্দ্র, রেস্তোরাঁয় ভিড় এড়ানোসহ ১৫ নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক ও মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. নাজুমল ইসলাম স্বাক্ষরে জারি করা ওই নির্দেশনায় বলা হয়, দক্ষিণ আফ্রিকায় শনাক্ত করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন (বি.১.১৫২৯) ছড়িয়ে পড়তে থাকায় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে সতর্ক করেছে। যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা এবং লেসোথোর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেছে। করোনাভাইরাসের ভ্যারিয়েন্টটি ডেলটার চেয়েও বেশি সংক্রামক বলে বিশেষজ্ঞরা মতামত প্রকাশ করেছেন।” রবিবার কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরী পরামর্শক কমিটি ওমিক্রনের বিস্তার ঠেকাতে ভ্রমণ সতর্কতা জারির পাশাপাশি সব ধরনের সমাবেশে জনসমাগম সীমিত করার সুপারিশ করে। পাশাপাশি মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মানা নিশ্চিত করা এবং আবারও বিনামূল্যে কোভিড পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় কমিটির সুপারিশে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের ১৫ নির্দেশনায় বলা হয়েছে : * দক্ষিণ আফ্রিকা, নামিবিয়া, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, এসওয়াতিনি, লেসোথোসহ যেসব দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে, সেসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের বিমানবন্দরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং জোরদার করতে হবে। * সব ধরনের (সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য) জনসমাগম নিরুৎসাহিত করতে হবে। * বাড়ির বাইরে সবার সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। * রেস্তোরাঁয় ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম আসনে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। * সকল প্রকার জনসমাবেশ, পর্যটন স্থান, বিনোদনকেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার, সিনেমা হল/থিয়েটার হল ও সামাজিক অনুষ্ঠানে (বিয়ে, বৌভাত, জন্মদিন, পিকনিক পার্টি ইত্যাদি) ধারণক্ষমতার অর্ধেক বা তার কম সংখ্যক লোক অংশগ্রহণ করতে পারবে। * মসজিদসহ সকল উপাসনালয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। * গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। * যেসব দেশে এই ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, সেসব দেশ থেকে আসা যাত্রীদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। * সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (সকল মাদ্রাসা, প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়) ও কোচিং সেন্টারে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে হবে। * সকল স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবাগ্রহিতা, সেবা প্রদানকারী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিকভাবে নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরাসহ সকল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। * স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভ্যাকসিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। * কোভিড উপসর্গ/লক্ষণযুক্ত সন্দেহজনক ও নিশ্চিত করোনা রোগীর আইসোলেশন ও কোভিড পজিটিভ রোগীর সংস্পর্শে আসা অন্যান্যদের কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করতে হবে। * কোভিড-১৯ এর লক্ষণযুক্ত ব্যক্তিকে আইসোলেশনে রাখা এবং তার নমুনা পরীক্ষার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তা করা যেতে পারে। * অফিসে প্রবেশ এবং অবস্থানকালীন বাধ্যতামূলক নাক-মুখ ঢেকে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাটা দাফতরিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। * মাস্ক পরাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সচেতনতা তৈরির জন্য কমিউনিটি পর্যায়ে মাইকিং ও প্রচার চালানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মসজিদ/মন্দির/গির্জা/প্যাগোডার মাইক ব্যবহার করা যেতে পারে এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর/ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যসহ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। ওমিক্রন অত্যন্ত বিপজ্জনক, প্রস্তুতি নিন ॥ ডব্লিউএইচও : বিশ্বের অন্তত ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের রূপান্তরিত ধরন ওমিক্রন ‘অত্যন্ত ঝুঁকি’ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। পাশাপাশি ভাইরাসের এই ধরনকে মোকাবিলায় বিশ্বকে দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিষয়ক এই সংস্থা। গতকাল সোমবার জেনেভায় ডব্লিউএইচওর সদর দফতর থেকে ওমিক্রন নিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তাসংস্থা রয়টার্স। বিবৃতিতে ১৯৪টি সদস্যদেশকে টিকাদান কর্মসূচির গতি আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও। সংক্রমণের নতুন ঢেউ দেখা দিলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে; সে বিষয়ে পরিকল্পনাও দ্রুত নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ‘মূল করোনাভাইরাস ও তার অন্যান্য রূপান্তরিত ধরনের তুলনায় ওমিক্রনের স্পাইক প্রোটিনের সংখ্যা অনেক বেশি। সংস্থাটির আশঙ্কা, এটি মহামারির পুরো চিত্র আরও বিপর্যয়কর করে তুলতে পারে।’ আগের সব ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় সম্ভাব্য অতি-সংক্রামক ওমিক্রন গত বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর থেকে এই ভ্যারিয়েন্ট অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, বতসোয়ানা, ব্রিটেন, কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, হংকং, ইসরায়েল, ইতালি এবং নেদারল্যান্ডস ও স্কটল্যান্ডে শনাক্ত হয়েছে। ওমিক্রনকে ‘উদ্বেগজনক ভ্যারিয়েন্ট’ হিসেবে তালিকাভূক্ত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলেছে, ‘এই ভ্যারিয়েন্টের তীব্রতার মাত্রা বোঝার জন্য কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে।’ শনাক্ত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা বা অন্য কোনো দেশে ওমিক্রনে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন সংবাদ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি এখনও আসেনি ধরনটির সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও। তবে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ তথ্য উপাত্ত বিজ্ঞানীদের হাতে পৌঁছেছে, তাতে এটি মূল করোনাভাইরাস ও তার অন্যান্য ধরনের তুলনায় অনেক বিধ্বংসী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিবৃতিতেও তার প্রতিফলন পাওয়া গেছে। সংস্থাটি বলেছে, ‘এই ধরনটির প্রভাবে দৈনিক সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে এবং সেই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে পারে করোনায় গুরুতর অসুস্থ রোগীর সংখ্যাও।’ ‘যদি এমন হয়, সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসার চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে বিশ্বজুড়ে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়বে করোনায় মৃত্যুর হারও। যেসব দেশে টিকাদান কম হয়েছে, সেই সব দেশের বয়স্ক লোকজন বিশ্বে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছেন’, বিবৃতিতে বলেছে ডব্লিউএইচও। তবে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন নিয়ে প্রথম সতর্ক ঘণ্টা বাজানো দক্ষিণ আফ্রিকার মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান অ্যাঞ্জেলিক কোয়েৎজি রোববার বলেছেন, তার কাছে চিকিৎসা নেওয়া সন্দেহভাজন কয়েক ডজন ওমিক্রন আক্রান্ত রোগীর শরীরে কেবলমাত্র মৃদু উপসর্গ দেখেছেন তিনি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ছাড়াই তারা পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ওমিক্রন ডেল্টার চেয়ে ভয়ংকর নয় ॥ ড. বিজন : করোনার দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রনের বর্তমান ধরন ডেল্টার চেয়ে ভয়ংকর নয়, তবে পুনরায় মিউটেশনের মাধ্যমে ভয়ংকর হতেও পারে বলে জানিয়েছেন অণুজীববিজ্ঞানী ও সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীল। করোনাভাইরাসের সবশেষ এই ভ্যারিয়েন্ট কোভিড জীবাণুর সবচেয়ে বেশি মিউটেট হওয়া সংস্করণ। এর মিউেটশনের তালিকা এত দীর্ঘ যে বিজ্ঞানীরা একে ভয়াবহ বলে বর্ণনা করেছেন। ইতোমধ্যে দেশে ওমিক্রন প্রতিরোধে ১৫ দফা পদক্ষেপ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গতকাল সোমবার করোনাভাইরাসের ওমিক্রন ধরন কতটা ভয়ংকর জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. বিজন কুমার শীল বলেন, ওমিক্রনের সিকুয়েন্সিং ডাটা আমি দেখেছি, করোনাভাইরাসের ডেল্টা ধরনের সঙ্গে তুলনা করে দেখলাম, ওমিক্রনের প্রায় ৫০ বার মিউটেশন হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টা মিউটেশন হয়েছে স্পাইক প্রোটিনে। আবার ১০টা মিউটেশন হয়েছে রিসেপ্টার ডোমেইন সাইডে। ভাইরাসের যে অংশটি প্রথম মানুষের দেহকোষের সঙ্গে সংযোগ ঘটায় তার নাম রিসেপ্টার বাইন্ডিং ডোমেইন। ওমিক্রনে ডেল্টার চেয়ে একটা পজিটিভ চার্ট বেশি। ডেল্টা ধরনে খুব শক্তিশালী একটা স্ট্রেইন ছিল পি৬৮১ পজিশনে, ওমিক্রনে এটা খুব বেশি শক্তিশালী নয়, দুর্বল। এটা যদি হলমার্ক হয়, তাহলে বর্তমানের ওমিক্রন ধরন ডেল্টার মতো ভয়ংকর নাও হতে পারে বলে আমার ধারণা। ওমিক্রন বিষয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা এখনও হয়নি, তবে বর্তমান সিকোয়েনসিংয়ে আমি যা দেখলাম, তাতে এটা ডেল্টার চেয়ে বেশি ভয়ংকর নয়, তবে সে আবারও পরিবর্তিত হতে পারে। করোনার ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে টিকা এবং ওষুধ কতটা কার্যকর জানতে চাইলে এই অণুজীববিজ্ঞানী বলেন, বর্তমানে করোনার যেকোনো টিকা প্রায় ৭০ শতাংশ সুরক্ষা দেবে। শুধু ওমিক্রন নয়, যদি আগের ওয়ান ভাইরাসও আসে মানুষের শরীরে ঢুকলে সে গ্রো করবে এটা নিশ্চিত। তবে যাদের শরীরে অ্যান্টিবডি রয়েছে, তাদের শরীরে ভাইরাসটি ঢুকে যখন রক্তের সংস্পর্শে আসবে, তখনই ভাইরাসটি মারা যাবে। রক্তের সংস্পর্শে আসার আগ পর্যন্ত ভাইরাসটি গ্রো করতে থাকবে, সেটা যেকোনো ভেরিয়েন্টেরই হোক না কেন। তিনি আরও বলেন, ওমিক্রন যদি বাংলাদেশে আসেও, ভাইরাসটি নিঃসন্দেহ গ্রো করবে। তবে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি রয়েছে, সেটা হাই লেভেল, লো লেভেল কিংবা মেমোরি সেল পর্যায়ে থাকুক না কেন। যেহেতু আমাদের শরীরে মেমোরি সেল রয়েছে, তা আমাদের সাহায্য করবে। তবে মার্চ মাসের মতো করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে না। তবে যাদের টিকা নেওয়া নেই, কিংবা শরীরে অ্যান্টিবডি বা মেমোরি সেল নেই, তার ক্ষেত্রে জটিলতা হতে পারে। সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক অবস্থান : করোনাভাইরাসের আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ অন্যান্য স্থল, সমুদ্রবন্দর ও রেলস্টেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত যাত্রী বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আগত যাত্রীদের দিকে কঠোর নজরদারি ও মনিটরিং করা হচ্ছে। বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি ফ্লাইট না থাকলেও মধ্যবর্তী বিভিন্ন দেশ হয়ে যাত্রীদের বাংলাদেশে আসার সুযোগ রয়েছে। তাই আফ্রিকা ও ওমিক্রন শনাক্ত দেশ থেকে কোনো যাত্রী বাংলাদেশে আসছে কিনা সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে। বেসামারিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমানচলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, ওমিক্রন যেন কোনোভাবেই দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আকাশপথ, স্থল, সমুদ্রবন্দরসমূহে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বন্দরগুলোর করণীয় কী তা নির্ধারণে গতকাল সোমবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক বসার কথা রয়েছে। বৈঠক শেষে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি হতে পারে বলে তারা জানান। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ সকালে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেদিন থেকে সব দেশকে করোনার নতুন এ ধরন সম্পর্কে সতর্ক করেছে, সেদিন থেকেই সাউথ আফ্রিকা ও অন্যান্য যেসব দেশে ওমিক্রনের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সেসব দেশের যাত্রীদের প্রতি অধিকতর খেয়াল রাখা হচ্ছে। তিনি জানান, আফ্রিকা থেকে সরাসরি ফ্লাইট না থাকলেও অন্যান্য দেশ হয়ে যাত্রী আসেন। তবে ওমিক্রন সংক্রমণের খবরের পর আইভরিকোস্ট থেকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে দুজন আফ্রিকান যাত্রী দেশে এসেছেন। বিমানবন্দরে তাদের প্রয়োজনীয় হেলথ স্ক্রিনিংসহ (টিকা সনদ পরীক্ষা, বিগত ১০ দিনের ভ্রমণকারী দেশের সংখ্যা এবং করোনার উপসর্গ রয়েছে কিনা ইত্যাদি) প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (২৮ নভেম্বর পর্যন্ত) দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বন্দর দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা সর্বমোট ৯ হাজার ৪৯২ জন যাত্রীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে শাহজালালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭ হাজার ৭৮০ জন, স্থলবন্দরে ১ হাজার ৪৪৯ জন এবং সমুদ্রবন্দরে ২৬৩ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। শুরু থেকে ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন বন্দরে আগত মোট ২৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৪ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৭ হাজার ৭৮০ জন, স্থলবন্দরে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৮ জন, রেলস্টেশনে ৭ হাজার ২৯জন এবং সমুদ্রবন্দরে ১ লাখ ১৬ হাজার ৭০০ জনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এদিকে রাজধানীসহ সারাদেশের জন্য সতর্কতামূলক ১৫ দফা নির্দেশনা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। নির্দেশনায় আক্রান্ত দেশসমূহ হতে আগত যাত্রীদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাসহ সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। গত রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও লাইন ডাইরেক্টর, সিডিসি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে এসব নির্দেশনা জারি হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, সাউথ আফ্রিকা ও অন্যান্য দেশে নতুন ধরনের করোনাভাইরাস ওমিক্রন’র সংক্রমণ দেখা দেওয়ায় অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব দেশকে করোনার এ ধরন সম্পর্কে সতর্ক করেছে। যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ সাউথ আফ্রিকা, নামিবিয়া জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানা, এসওয়াতিনি এবং লেসোথোর সঙ্গে আকাশপথ ও সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছে। করোনার সাউথ আফ্রিকান এ ভ্যারিয়েন্ট করোনার ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট থেকেও অধিক সংক্রামক বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাই এ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here