ঘুরে এলাম মায়ুং কপাল

0
180

দফায় দফায় লকডাউনে দেশের সাধারণ নাগরিকদের যাপিতজীবন প্রায় নাকাল। সেই সঙ্গে বেহাল ভ্রমণপিপাসুদের আনন্দময় জীবন। এক করোনাভাইরাসের ভয়ে মানুষগুলো ঘরে থাকতে থাকতে আরও কত ভাইরাস যে শরীরে বাসা বেঁধেছে- এ খবর ক’জনাই বা আর রেখেছে। বুঝবে গিয়ে পড়ে যখন গভীর ক্ষত সৃষ্টি করিবে।

যাক সেসব তাত্ত্বিক কথাবার্তা। গত ২১ জুলাই ঈদের রাত হতে ২৩ জুলাই ভোর ৬টা পর্যন্ত সুযোগ পেয়েছিলাম। সেই সময়টুকু পুরোপুরি কাজে লাগাতে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ ভুল করেনি। ত্বরিতগতিতে খাগড়াছড়ি রুটের বাসের টিকিট কেটে সহযোগিতার প্রত্যাশায় বন্ধুবর সাংবাদিক সমির মল্লিক ও শাহজাহানকে জানিয়ে দিই। নির্বিঘ্ন ভ্রমণে তারা বেশ হেল্পফুল।

ঢাকা থকে রাত সাড়ে ১১টার বাসে চড়ে ভোর প্রায় ৬টায় খাগড়াছড়ি নামি। বরাবরের মতো ট্রাভেলারদের পদচারণায় শাপলাচত্বর মুখোর নয়।

হোটেলে বাড়তি কাপড়ের ব্যাগ রেখে বের হয়ে যাই পানছড়ি রোডের প্যারাছড়ার পথে। সেখানে আগেই হাজির ছিলেন গাইড জগত জ্যোতি ত্রিপুরা। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে জগতের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নিই। এবার যাওবার পালা মূল গন্তব্য মায়ুং কপাল। পুরোটা পথ হেঁটেই যেতে হবে। আসা-যাওয়া প্রায় ৫ ঘন্টার হাইকিং-ট্র্যাকিং।

কিছুদূর যাওয়ার পরেই চেঙ্গী নদী। ছোট্ট খেয়ায় পারাপার। নদীর গভীরতা তেমন না হলেও স্রোত ছিল বেশ। চেঙ্গীর মাঝামাঝি দেহ অনুভব করে মৃদু বাতাসের শিহরণ। নদীর দুই কূলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বেশ নজর কাড়ে। পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলো এমনিতেই অন্যসব নদীগুলোর চাইতে ভিন্নরকম সৌন্দর্য বহন করে থাকে।

 

চেঙ্গী নদী পার হয়ে চ্যালাছড়া পাহাড়ি গ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে থাকি। যেতে যেতে চোখে পড়ে লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দিরের স্থাপনা। আরও কিছুটা দূর আগানোর পর বুনো পরিবেশ দিয়ে ঘেরা পথে উঠে যাই। এখন শুধু উপর দিকেই উঠছি। মাথার উপর আকাশ ছোঁয়া গাছের ছায়া। অচেনা পাখপাখালির সুর। বন্যফুলের ঘ্রাণ। সুনসান নীরবতা সঙ্গী করে যেতে যেতে শঙ্খমোহনপাড়ায় থাকা বটবৃক্ষর ছায়াতলে জিরিয়ে নিই।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ত্রিপুরাদের বসবাসের পাড়াটা ছবির মতো সুন্দর। বেশিরভাগ ঘর মাটি ও ছনের তৈরি। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নও বেশ। ইচ্ছে করেই কারও সঙ্গে তেমন আলাপ জমিয়ে তুলি নাই। কারণ শেষে না আবার করোনার ভয়ে পাড়ার কারবারি আমাদের ফেরত পাঠায়। তাই মনের ভিতরও কাজ করছিল সেই ছোট্টবেলার নিত্যদিনের চোর-পুলিশ খেলার কাহিনী। এসব কারণেই বাড়তি সতর্কতা হিসেবে বরাবরের মতো এবার স্থানীয়দের সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করিনি।

জিরানোর সময়টুকুর মধ্যেই গাইডের সংগ্রহ করা টিপা ফল খেয়ে আবারো হাইকিং। এবার কিছুটা জঙ্গলি পথ মাড়িয়ে দূর থেকেই দেখা পাই কাঙ্ক্ষিত মায়ুং কপাল পাহাড়ের। সুবহানাল্লাহ, প্রথম দেখাতেই চোখ জুড়িয়ে যায়। চারপাশে পাহাড় আর পাহাড়। সিঁড়ি বেয়ে উপর দিকে উঠতে থাকি। সিঁড়িটা এমনভাবেই খাঁড়া হয়ে উপর দিকে উঠছে যে,একটা সময় মনে হবে এই বুঝি নীল আসমানে ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘ মালা ছুঁয়ে ফেলব। সেই সঙ্গে ডানে-বামে পাহাড়ের ঢেউ খেলানো দৃশ্যের অপার্থিব সৌন্দর্য। আসলে তখনকার অনুভূতিটা এখন লিখে বোঝানো দায়। অনুভব করতে হলে ছুটে যেতে হবে মায়ুং কপাল।

গাইডের ভাষ্যমতে, ৩১৫ সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে যাই মুয়ুং কপাল পাহাড়ের উপরে। ওহ আল্লাহ, এ যেন আরেক জগত। পাহাড় থেকে পাহাড় দেখা। বর্ষা মৌসুম হওয়ায় পাহাড়গুলো গাঢ় সবুজে মোড়ানো। গাছের পাতাগুলো ছিল বৃষ্টি ভেজা চকচকে। দুই চোখ যতদূর যায়, শুধু পাহাড় আর পাহাড়। আমরা আরও সামনের দিকে এগোতে চাই। কিন্তু গাইডের সবুজ সঙ্কেত না থাকায়, সিঁড়ির কাছাকাছিই থাকি। ওখান থেকেই নয়ন ভরে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করি।

মূলত পাহাড়ে বসবাস করা ত্রিপুরাসহ মোট ১৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের চলাচলের সুবিধার্থে ১৩ জুন ২০১৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক সিঁড়িটি নির্মাণ করা হয়; যা এখন ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ত্রিপুরা ভাষায় হাতির মাথাকে মায়ুং কপাল বলা হয়। পাহাড়টির সামনের অংশ অনেকটা হাতির মাথার মতো দেখতে। সেই কারণেই এর নাম মায়ুং কপাল। মোট ২৬৭ ধাপের সিঁড়িটির উচ্চতা প্রায় ৪০০ ফুট। আর মায়ুং কপাল পাহাড়ের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ১২০৮ ফুট। সিঁড়িটি আনুমানিক প্রায় ১২০ ডিগ্রি এঙ্গেলে খাড়া হয়ে উপর দিকে উঠেছে। যে কারণে অনেকেই স্বর্গের সিঁড়ি নামেও ডেকে থাকে।

 

সবচাইতে মজার ব্যাপার মায়ুং কপাল সিঁড়ি বেয়ে উঠার মাঝামাঝি সময় যেরকমভাবে শরীরে বাতাস আছড়ে পড়ে শীতলতা আনে তা সিঁড়ির নিচে-উপরে ওরকমটা পাওয়া যায় না। মায়ুং কপাল পাহাড়ে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে, দিপা ত্রিপুরার বাগানের পাহাড়ি আম রাঙগুইর স্বাদ নিয়ে ফিরতি পথ ধরি।

যাবেন কীভাবে

ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস খাগড়াছড়ি রুটে চলাচল করে। খাগড়াছড়ি শহর হতে অটো বা যেকোনো বাহনে পানছড়ি রোডের প্যারাছড়া ব্রিক ফিল্ড। সেখান থেকে চেঙ্গী নদী পার হয়ে ঘণ্টা দুই হাইকিং-ট্র্যাকিং। তবে নদী পার হয়েই চ্যালাছড়া পাড়ার কোনো দোকানির সঙ্গে কথা বলে, স্থানীয় কাউকে নিয়ে নেয়াটাই ভালো হবে।

সতর্কতা

মায়ুং কপাল ভ্রমণের জন্য পেশাদার গাইড নেই। সুতরাং স্থানীয় যাকে নেবেন বুঝেশুনে নিতে হবে। পর্যাপ্ত সুপেয় পানি ও পরিমাণ অনুযায়ী শুকনো খাবার সঙ্গে নিতে হবে। গাইডের পরামর্শ ছাড়া কোনো পাড়া বা পাহাড়ের পথে যাবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here