ভাটি অঞ্চলে যাই

0
186

মানুষমাত্রই মুক্তবিহঙ্গে ঘুরে বেড়াতে চায়। মানুষ বন্দি থাকতে মোটেও পছন্দ করে না; কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। একটা সময় সবকিছু থাকতেও শুধুমাত্র সময়ের অভাবে ঘুরে বেড়ানোর শখটাকে মনের ভেতর গলাটিপে ধরতে হয়। প্রজাপতির মতো ঘুরে বেড়াতে প্রচুর টাকার প্রয়োজন হয় না। কিন্তু জগত সংসারে নানান ঝামেলায় ভ্রমণের শখ পূরণের জন্য সময় আর বের করা যায় না। তাই সময় কারও জীবনে নিষ্ঠুর হওয়ার আগেই ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়ানো চাই।

হুট করেই এক রাতে সময়কে তুড়ি মেরে আমি আর মেহেদি কমলাপুর ট্রেন স্টেশনে গিয়ে উঠে পড়ি হাওর এক্সপ্রেসে। গন্তব্য ভাটি অঞ্চল মোহনগঞ্জ। বহু বছর পর ট্রেনে চড়লাম। বাদ দিয়েছিলাম যে বছর খুলনা স্টেশনে ঢাকাগামী রাত ৯টার ট্রেন প্রায় ভোররাতে স্টেশন ত্যাগ করেছিল।

যাক এবার আর তেমন হয়নি। জাস্ট প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা লেট। হুইসেল বাজিয়ে ঝিকঝিক শব্দ তুলে ট্রেন ছুটেছে তার ঠিকানায়। তাপানুকূল কেবিন। বেশ পরিপাটি। কেবিন বয় নাশতার কথা জানাল। পেট ভরা তবুও হ্যাঁ সূচক জবাব দিতেই সার্ভ করতে দেরি হলো না। খেয়েদেয়ে দুজনেই খুব আরামের একটা ঘুম দিয়ে সকাল ৬টায় মোহনগঞ্জ রেলস্টেশনে নামলাম। বহু বছর পর এদিকটায় আসলাম। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। যে বদলানোর ঢেউ মানুষের চরিত্রের ওপরও আছড়ে পড়েছে।

 

রেলস্টেশনের পাশের হোটেলে তেল ছাড়া মচমচা পরোটা আর ডিম ভাজা দিয়ে সকালের নাশতা সারলাম। আমি আবার ভাটি অঞ্চলে এলে রাস্তার ধারের হোটেলগুলোতে পরোটা না খেলেই নয়। কেন জানি আমার কাছে অন্যরকম স্বাদ লাগে। এবার ফুপার বাড়িতে যাওয়ার জন্য অটোতে চড়লাম। চতুর চালক সম্ভবত ইচ্ছে করেই প্রথমে ভুল জায়গায় নিয়ে অতিরিক্ত কিছু টাকা খসালো। ওই যে বললাম না, চরিত্রের মাঝেও আছড়ে পড়েছে।

গাড়ি ঘুরিয়ে এবার গার্লস স্কুলের সামনে এলাম। ফুপাতো ভাই তৌহিদ আগেই অপেক্ষায় ছিল। বিয়েবাড়ি, অনেক স্বজন সমাবেশ। কিন্তু আমার মন তো পড়ে আছে হাওড়ের হিজল-করচ গাছের ছায়াতলে। কোনোমতে সবার সঙ্গে হাই-হ্যালো সেরে ছুটলাম তেঁতুলিয়া। এবার মনে হয় ভাগ্য ভালো। অটোচালককে বেশ ভালোই মনে হলো। গ্রাম্যপথে অটো চলে; যেথায় খুশি সেথায় থামি।

মোহনগঞ্জ একটি প্রাচীন জনপদ। ভাটি অঞ্চলের রাজধানী হিসেবেও খ্যাত। চালক রইস, আমাদের নানান অনুসন্ধানী প্রশ্নে একজন দক্ষ গাইডের মতোই ব্রিফিং দিচ্ছেন। গ্রাম্যপথে চলার সময় বাড়তি আনন্দ জোগায়, অচেনা পাখির সুর, পুকুরে দুরন্ত শিশুদের ডিগবাজি, কৃষাণ-কৃষাণীদের হাসি।

চলতে চলতে একটা সময় বুঝে গেলাম, এই অটোচালক লোকটা আসলেই ভালো। নানান আলাপচারিতায় ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তেঁতুলিয়া গ্রামে পৌঁছাই। গ্রামটা খুব সুন্দর। একেবারে ডিঙ্গিপোতা হাওড়ের তীরেই। গ্রামের মানুষগুলোর সঙ্গে পরিচিত হই। এটা-সেটা দোকান থেকে কিনে খাই। বলা যায় এটা আমাদের দলছুট ভ্রমণ সংঘের অন্যতম হবি। ঘাটে গিয়ে ট্রলারে চড়ি। বিশাল হাওড়ের বুকে ভেসে বেড়াই।

চারদিকে থৈ থৈ পানি। ভটভট শব্দ তুলে ট্রলার ডিঙ্গিপোতা হাওড়ে ভেসে বেড়ায়। দূরের এক হিজল গাছের ছায়ায় যাই। চারদিকে অথৈ পানি। মাঝে গাছটি শির উঁচু করে জেগে রয়েছে। এক অন্যরকম ভালোলাগার মুহূর্ত। তাছাড়া বর্ষাতে হাওড়ের সৌন্দর্য এমনিতেই বেড়ে যায় বহুগুণ। গাছের ডালের সঙ্গে লাগা পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ট্রলার ছেড়ে গাছে চড়ি। পা ভিজাতেই সারাদেহে অদ্ভুত শিহরণ। আকাশে ভেসে বেড়ায় চিল। নয়া পানিতে মাছের লুকোচুরি। মৎস্য শিকারিরা হন্তদন্ত। আমরা খুঁজি জীবনের সুখ। সেই সুখের খুঁজে উকিল মেহেদি বাঁদুড়ের মতো গাছের ডালে ঝুলতে গিয়ে, ধপাস করে পানিতে। ও হয়তো জীবনের মানে খুঁজে পেয়েছে। শেষে আরও কি-না কী খুঁজবে, কে জানে! তাই আর দেরি নয়।

 

মাঝি আবারো নৌকা ভাসাল। রইস জানাল,শুকনো মৌসুমে এই ডিঙ্গিপোতা হাওড়ের বুকে বিভিন্ন জাতের ধান চাষাবাদ হয়; যা দেশের খাদ্যভাণ্ডারের চাহিদা মেটাতে বেশ সহায়ক হয়। এই মোহনগঞ্জের হাওড়গুলো হতে প্রচুর মিঠাপানির মাছ আহরণ হয়ে থাকে। ডিঙ্গিপোতা হাওড় হয়ে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওড় পর্যন্ত যাওয়া যায়; যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য নতুন কিছু দেখার শখ মেটাবে। নীল আসমানের তলায় মৃদু বাতাসে, হাওড় জলে ভাসতে ভাসতে বেলা গড়িয়ে প্রায় মধ্য দুপুর। দিনটি ছিল জুমাবার।নিতে হবে নামাজের প্রস্তুতি; যাই এবার তীরে।

যাবেন কীভাবে: বাস ও ট্রেন,দুইভাবেই যাওয়া যায়। সবচাইতে আরামদায়ক হবে রাতের বাস বা ট্রেনে গেলে। ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল ও কমলাপুর হতে দিনে-রাতে বাস-ট্রেন মোহনগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। মোহনগঞ্জ রেলস্টেশন হতে অটোতে তেঁতুলিয়া নৌঘাট।

খরচ: জনপ্রতি দুই রাত একদিনে মাত্র দুই হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট। অবশ্য এটা নির্ভর করবে আপনার বিলাসিতার ওপর।

ভ্রমণ তথ্য: রাতের বাস-ট্রেনে গেলে সারাদিন ঘুরে আবার রাতেই ঢাকা ফেরা যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here