নিজস্ব প্রতিবেদকঃ
রাজধানীর আলোচিত ট্রাভেল প্রতিষ্ঠান ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের কোটি টাকার প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাৎ মামলায় আদালত থেকে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। চলমান মামলার প্রেক্ষাপটে কোম্পানিটির টিকিট রিফান্ড কার্যক্রমে অনিয়ম, অনুমতি ছাড়া লেনদেন ও প্রতারণার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট রৌনক জাহান তাকি এক আদেশে নির্দেশ দিয়েছেন— ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের সকল রিফান্ড কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখতে।
আদালতে উপস্থাপিত আবেদন ও মামলার নথিপত্রে বলা হয়, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল তাদের অনলাইন টিকিট রিফান্ড প্রক্রিয়ায় যাত্রী ও ট্রাভেল এজেন্সির অনুমতি ব্যতিরেকে একাধিক অগ্রহণযোগ্য রিফান্ড এবং প্রতারণামূলক আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করেছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতের কাছে এ ধরনের লেনদেন অবিলম্বে বন্ধ করা এবং রিফান্ডকৃত অর্থ জরিমানা সহ আদায়ের আবেদন জানান। আদালত নালিশী দরখাস্ত ও উপস্থাপিত সকল কাগজপত্র গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন এবং মন্তব্য করেন যে মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন অবস্থায় রয়েছে।
আদেশে ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, যেহেতু ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল তাদের অনলাইন সার্ভার বন্ধ করে দিয়েছে, সেহেতু বাদীপক্ষের ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে প্রদত্ত টিকিট মূল্যের বিপরীতে অর্থ আত্মসাৎ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। একই সঙ্গে আদালত উল্লেখ করেন, এই অনলাইন সার্ভার বন্ধের কারণে বিপুল পরিমাণ গ্রাহক ও এজেন্সির লেনদেন ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং এতে দেশের এভিয়েশন খাতে আর্থিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ফলে আদালত এভিয়েশন সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে স্পষ্ট নির্দেশ দেন— তারা যেন ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের কোনো রিফান্ড কার্যক্রমে অংশগ্রহণ না করে এবং নতুন কোনো অর্থ ফেরত প্রক্রিয়া শুরু না করে। এই আদেশে ম্যাজিস্ট্রেট রৌনক জাহান তাকি স্বাক্ষর করে বলেন, “অত্র আদেশ কার্যকর না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা আইনগত জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে।”
আদেশের অনুলিপি প্রেরণ করা হয়েছে দ্য ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (IATA), ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স লিমিটেড, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেড, চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স, জিডিএস (GDS) ও এনডিসি (NDC)–এর নিকট, যাতে তারা অবিলম্বে রিফান্ড কার্যক্রম বন্ধ রাখে এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষা করে।
ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর তত্ত্বাবধানে তদন্তাধীন। পিবিআই সূত্রে জানা যায়, কোম্পানিটির অনলাইন সার্ভার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে একাধিক ট্রাভেল এজেন্সি ও যাত্রীর কোটি কোটি টাকা অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। অনেক এজেন্সি ইতিমধ্যে প্রতারণার অভিযোগে পৃথক মামলা দায়ের করেছে। তদন্তকারীরা এখন ব্যাংক হিসাব, ডিজিটাল ট্রানজেকশন, এবং আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের দিকগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করছেন।
এদিকে, ক্ষতিগ্রস্ত এজেন্সিগুলোর মালিকরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তারা ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ টিকিট বিক্রি করছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সিস্টেম বন্ধ করে দিলে কোটি টাকারও বেশি রিফান্ড আটকে যায়। এক ভুক্তভোগী এজেন্সি মালিক বলেন, “আমরা নিয়ম মেনে কাজ করেছি, অথচ কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের অর্থ আটকে রাখা হয়েছে। রিফান্ড বা টাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আদালতের এই নির্দেশ আমাদের জন্য নতুন আশার আলো।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই নির্দেশে মামলার তদন্ত আরও এগিয়ে যাবে এবং অনলাইন ট্রাভেল ব্যবসায় অনিয়ম রোধে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকবে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে ট্রাভেল সেক্টরে কোনো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা না থাকায় এই ধরনের প্রতারণা বাড়ছিল।
ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল এক সময় দেশের অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন ট্রাভেল কোম্পানি হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের প্রচারণায় দাবি করা হতো, তারা দেশের প্রথম ডিজিটাল ট্রাভেল প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এজেন্সি ও গ্রাহকের কাছ থেকে অভিযোগ জমতে থাকে যে কোম্পানিটি টিকিট বিক্রয়ের টাকা ফেরত দিচ্ছে না, অজুহাতে রিফান্ড স্থগিত রাখছে এবং আর্থিকভাবে অনৈতিক লেনদেন করছে।
আদালতের সাম্প্রতিক এই নির্দেশনার মাধ্যমে মামলাটি নতুন একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। এখন সব রিফান্ড কার্যক্রম স্থগিত থাকায় তদন্তের আওতায় থাকা কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। পিবিআই বলছে, আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা ব্যাংক ও অনলাইন সিস্টেমে আটকে থাকা অর্থের উৎস, স্থানান্তর ও ব্যবহারের রূপরেখা আরও বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করতে পারবে।
এই নির্দেশে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাভেল এজেন্সি ও যাত্রীরা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই আশা করছেন, আদালতের তত্ত্বাবধানে এবং পিবিআইয়ের তদন্তে ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ পাবে এবং যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা তাদের প্রাপ্য অর্থ ফিরে পাবেন।
দেশের ট্রাভেল সেক্টরে কোটি কোটি টাকার এই প্রতারণার ঘটনায় আদালতের হস্তক্ষেপকে অনেকেই একটি “নজিরবিহীন উদ্যোগ” হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি শুধু একটি মামলার সিদ্ধান্ত নয়, বরং অনলাইন ট্রাভেল ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

