মোঃ শাহজালাল, বরগুনা থেকে:
উপকূলীয় জেলা বরগুনায় দিন দিন গভীরতর হচ্ছে কর্মসংস্থানের সংকট। শিল্প-কারখানা নেই, কৃষিতে অনিশ্চয়তা, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি সব মিলিয়ে শ্রমজীবী মানুষের জীবন আজ দুঃসহ হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে শহরের বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে শত শত দিনমজুর। তবুও কাজ মেলে না। যে কাজ জোটে, তাতেও মজুরি কম, অনিশ্চয়তা বেশি।
জেলার প্রধান পেশা কৃষি হলেও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিতে ফসল উৎপাদন কমেছে। মৌসুম শেষে কৃষিশ্রমিকদের হাতে আর কোনো আয়ের পথ খোলা থাকে না। একইভাবে মৎস্যশিল্পেও স্থবিরতা চলছে। নদী-সাগরে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক জেলে ও নৌযান শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
বরগুনা শহরের পৌর সুপার মার্কেটের সামনে কাজের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুর আব্দুল হালিম বলেন, ‘এক সময় সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন কাজ পেতাম। এখন দুই দিন কাজ পেলেই ভাগ্যবান মনে করি। ঘরে বাচ্চাদের খাবার জোগাড় করতে না পারলে বুকটা কেমন হাহাকার করে, তা কারো বলার মতো না।’
তালতলী এলাকার নারী শ্রমিক জেসমিন বেগম জানান, ‘ধান কাটার মৌসুম বাদে আর কাজ থাকে না। কখনো মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করি, তাতেও মজুরি খুব কম। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়।’
জেলার ছয়টি উপজেলায় করা এক বেসরকারি জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৪৫ শতাংশ শ্রমজীবী পরিবার বর্তমানে নিয়মিত আয়ের বাইরে। এ অবস্থায় পরিবারগুলো খাদ্যসংকট, ঋণের চাপ এবং বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে ঢাকাসহ বড় শহরে পাড়ি দিচ্ছেন। কিন্তু সবার পক্ষে সেই পথ খোলা নয়। বিশেষ করে নারী, প্রবীণ ও অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সীমিত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগোনারী প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসি বলেন, বরগুনায় ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি-ভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, হস্তশিল্প, নারীদের ঘরে বসে কাজের উদ্যোগ, মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিটসহ স্থায়ী কর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন জীবিকা কর্মসূচি না চালু করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
কর্মসংস্থানের অভাবে বরগুনার হাজারো শ্রমজীবী আজ মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য। তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়, নিয়মিত কাজ, ন্যায্য মজুরি আর বেঁচে থাকার নূ্যনতম নিশ্চয়তা। কিন্তু সেই সামান্য প্রত্যাশাও আজ অধরা হয়ে গেছে উপকূলের এই দরিদ্র মানুষের কাছে।

