রিপোর্ট : সাউদী হাসনাত নীলঃ
আজ ২৭ জানুয়ারি। ঐতিহাসিক রক্তাক্ত সলঙ্গা বিদ্রোহ দিবসের ১০৪ বছর পূর্তি। ১৯২২ সালের এই দিনে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আন্দোলনে অংশ নেওয়া হাজারো নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা চালায় ব্রিটিশ বাহিনী। উপমহাদেশের ইতিহাসে এমন নৃশংসতার দৃষ্টান্ত বিরল হলেও, শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এই ঘটনা এখনও অনেকের কাছে অজানা।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া থানার ত্রিমোহনী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী সলঙ্গা হাটে এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সে সময় সলঙ্গা ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। হাটবারে এখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো। বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষিপণ্য ও গবাদিপশু কেনাবেচার জন্য মানুষ ভিড় করত এই হাটে।
গান্ধীজীর নেতৃত্বাধীন অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিদেশি পণ্য ও মদ বর্জনের আন্দোলন চলছিল সলঙ্গা হাটে। মুসলিম অধ্যুষিত এই অঞ্চলে কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তরুণ নেতা মাওলানা আব্দুর রশিদ (পরবর্তীতে তর্কবাগীশ)। অহিংস আন্দোলনে অংশ নিতে সেদিন সলঙ্গা হাটে তিল ঠাঁই ছিল না। স্বাধিকার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন।
এই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে ব্রিটিশ বাহিনী আকস্মিক ও নির্বিচারে গুলি চালায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ইতিহাসবিদদের মতে, সেদিন গণহারে মানুষ হত্যা করা হয়। সরকারি নথিতে আনুমানিক সাড়ে চার হাজার নিহতের তথ্য পাওয়া গেলেও স্থানীয় ইতিহাসবিদদের দাবি, নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় দশ হাজার। নিহতদের অনেককে রহমতগঞ্জ এলাকায় গণকবরে দাফন করা হয়।
এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মাত্র ২২ বছর বয়সী এক যুবক—আব্দুর রশিদ। বিদেশি পণ্য বর্জনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীর চরম নির্যাতনের শিকার হন এবং রক্তাক্ত অবস্থায় গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে তিনি মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ নামে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ঋণসালিশী বোর্ড প্রবর্তন, বর্গা আন্দোলনসহ গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।
ইতিহাসের এই ভয়াবহ অধ্যায়টি স্বাধীনতা সংগ্রামের এক রক্তাক্ত সিঁড়ি হলেও আজও সলঙ্গা বিদ্রোহ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। সরকারি ভাবে দিবসটি পালন করা হয় না, পাঠ্যপুস্তকে নেই এর বিস্তারিত উল্লেখ। শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতিসৌধ বা সংরক্ষণাগার।
ইতিহাসবিদ ও সচেতন মহলের দাবি, নতুন প্রজন্মের কাছে এই গণহত্যার ইতিহাস তুলে ধরতে সলঙ্গা বিদ্রোহকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া এবং পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে শহিদদের স্মরণে স্থায়ী স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণেরও জোর দাবি উঠেছে।

