গৌতম কুমার মহন্ত, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর সীমান্ত ঘেঁষা আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান দৃষ্টি নন্দন করে গড়ে তোলা হলেও কাংখিত পর্যটক না আসায় হতাশায় ভুগছে ব্যবসায়ীরা বনের ভিতর গড়ে উঠেছে মাদকাসক্তদের অভয়ারণ্য।
পর্যটকদের অভিযোগ আলতাদীঘি চত্বরে নেই ভালো মানের খাবারের হোটেল ও রেষ্ট হাউস এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে বেড়েছে মাদকাসক্তদের উৎপাত। পার্শ্ববর্তী জয়পুরহাট জেলা সদর থেকে আসা জয়পুরহাট কাশিয়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ আলম হোসেন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এ উদ্যান এলাকায় স্থায়ীভাবে একটি পুলিশ ফাঁড়ি জরুরি হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার বলেন, এ আলতাদীঘি চত্বরে কয়েকজন যুবক তাদেরসহ অপরিচিত ৪ জন নারী পর্যটকদের সঙ্গে অযাচিত ভাবে অশোভনীয় আচরণ করেছে। তাদের মতে ওইসব যুবকের আচরণে ধারণা করা হচ্ছে তারা সকলেই মাদকাশক্ত। ধামুইরহাট উপজেলা প্রেসক্লাব সভাপতি আব্দুল মালেক বলেন, আলতাদীঘি জাতীয় উদ্যান এলাকা এক সময় মাদকের স্বর্গ রাজ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। তবে সম্প্রতি সময়ে আইন শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতায় বর্তমানে অনেকটায় নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।তিনি বলেন, উদ্যান এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ির দাবী এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের। উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুরে জাতীয় এ উদ্যানে যাতায়াতের প্রতিটি সড়ক পাকা করণসহ আলতাদীঘি পুনঃখনন এবং দীঘির চারপাশে পর্যটকদের বসার জন্য একধিক সেড এবং একটি দৃষ্টি নন্দন টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে।
সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার ছুটির দিন অল্প সংখ্যক পর্যটক আসলেও অন্য দিন গুলোতে প্রায় জনসূন্য থাকায় স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসায়ী তাদের ব্যবসা ধরে রাখা নিয়ে হতাশায় ভুগছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ফাস্ট ফুট নারী দোকান মালিক বলেন, সম্প্রতি সময়ে মাদকাসক্তদের দৌড়াত্ব বেড়ে যাওয়ায় তাদের কাছে নারীসহ পুরুষ পর্যটকরা প্রায়দিন নানাভাবে হেনস্তার শিকার হচ্ছে। পর্যটক হেনস্তার শিকারসহ নানা কারণে জাতীয় উদ্যান আলতাদীঘি বিমুখ হচ্ছে পর্যটকরা। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তার কোন ঘামতি নেই দাবী করে স্থানীয় সমাজ সেবক রাজন হোসেন বলেন, ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা এ উদ্যান এলাকায় দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বিজিবি টহল দেয়। এবিষয়ে ধামুইরহাট থানার অফিসার ইনচার্জ ওসি মোকলেছুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা তাঁকে পাওয়া যায়নি।
আলতাদীঘির ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে লোককাহিনী হিসেবে প্রচলিত আছে, এলাকার প্রজা সাধারণের পানিয় জলের সংকট নিরসন কল্পে, রাজা বিশ্বনাথ রাজমাতার সন্তুষ্টিকল্পে দীঘিটি খনন করেন তিনি। রাজমাতার শর্ত ছিল, তিনি পায়ে হেঁটে যতদূর অবধি যেতে পারবেন সেই পর্যন্ত দীঘিটি খনন করতে হবে। রাজমাতার ওইশর্ত পূরণের লক্ষ্যে মন্ত্রীবরের সঙ্গে রাজা আলোচনা ও পরামর্শ করে আলতা নিয়ে আসেন। এর কয়েকদিন পর ঘটা করে মন্ত্রীবর নিয়ে রাজা এবং রাজমাতা হাঁটতে শুরু করেন এবং মন্ত্রীগন রাজমাতাকে অনুসরণ করতে থাকেন। কিন্তু রাজমাতা তাঁর পায়ে হাঁটা পথ শেষ না করে তিনি হাঁটতেই থাকেন। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি প্রতিকুলে যাওয়া দেখে মন্ত্রীবর দীঘির শেষ প্রান্তে রাজমাতার পায়ে আলতা ছিটিয়ে দিয়ে তাঁকে থামিয়ে দেন এবং রাজমাতাকে বলা হয়, মা তোমার পা ফেটে রক্ত বেড়িয়েছে। তুমি আর হাঁটতে পারবে না। মন্ত্রীবরের কথায় ওইস্থানে গিয়ে রাজমাতা তাঁর পায়ে হাঁটা বন্ধ করেছিলেন। তখন শুরুর স্থান থেকে ওই পর্যন্ত রাজা বিশ্বনাথ দীঘিটি খনন করেছিলেন। ওইসময় থেকেই এ দীঘিটি আলতাদীঘি নামে পরিচিতি লাভ করে। ঐতিহাসিক এ আলতাদীঘির জলাশয়টি ঠিক কতশত বছর আগে খনন করা হয়েছে এর তথ্য অজানায় রয়েছে গেছে। তবে ইতিহাস বিদদের ধারণা জগদ্দল বিহারের সমসাময়িক অথবা পাল যুগেরও আগে এ আলতাদীঘি খনন করা হতে পারে।জেলার ধামুইরহাট উপজেলার আলতাদিঘী দিঘীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল বনভূমি। শালবন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪.১২ হেক্টর জমির এ বনভূমির মধ্যভাগে প্রায় ৪৩ একর আয়তনের বিশাল এ দিঘী। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে আলতাদিঘী জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করেন এবং একই সালের ২৪ ডিসেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও জাতীয় উদ্যানের পশের ১৭.৩৪ হেক্টর বনভুমিকে ২০১৬ সালের ৯ জুন বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর।

