• আজকের পত্রিকা
  • ই-পেপার
  • আর্কাইভ
  • কনভার্টার
  • অ্যাপস
  • প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’: কল্যাণরাষ্ট্র নির্মাণে রাষ্ট্রভাবনার নীতিগত রূপান্তর 

     swadhinshomoy 
    24th Feb 2026 1:40 pm  |  অনলাইন সংস্করণ Print

    ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

    বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তায় দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল—রাষ্ট্র নাগরিকের জীবনে উপস্থিত, কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে নয়; ক্ষমতাশালী, কিন্তু সংবেদনশীল নয়। নির্বাচন এলেই উন্নয়ন, সহায়তা ও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে; কিন্তু ক্ষমতা অর্জনের পর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত থেকেছে। এই বাস্তবতায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে কেবল একটি সহায়তা প্রকল্প হিসেবে দেখলে তার অন্তর্নিহিত রাজনৈতিক ও নীতিগত তাৎপর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

    এটি আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা।
    বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর নির্বাচনি অঙ্গীকার থেকে এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং একটি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।

    প্রতিশ্রুতিনির্ভর রাজনীতি থেকে দায়বদ্ধ রাষ্ট্রচিন্তার দিকে

    বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনি ইশতেহার সাধারণত ছিল উচ্চারণনির্ভর দলিল। জনগণের সামনে প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হতো, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়, সক্ষমতা ও সদিচ্ছার অভাব বারবার প্রকাশ পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার গঠনের পরপরই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সামনে আনা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।

    এটি বোঝায় যে, রাষ্ট্র এখন আর কেবল ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে আবদ্ধ থাকতে চায় না; বরং নাগরিকের জীবনমান উন্নয়নকে রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করতে আগ্রহী। এই পরিবর্তন রাজনীতির ভাষা ও আচরণ—উভয় ক্ষেত্রেই একটি গুণগত রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়।

    সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি

    বাংলাদেশে সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির সংখ্যা কখনোই কম ছিল না। কিন্তু মূল সমস্যা ছিল সমন্বয়ের অভাব এবং সঠিক উপকারভোগী চিহ্নিতকরণের দুর্বলতা। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্র পরিবার সহায়তার বাইরে রয়ে গেছে, আবার একই পরিবার বা ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির সুবিধা পেয়েছে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ব্যাহত হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের আস্থায় চিড় ধরেছে।

    ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি এই দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকটের উত্তরণে একটি নতুন পথ দেখায়। একক পরিচয়ভিত্তিক নিবন্ধন, স্থানীয় প্রশাসনের সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যাচাই—এই সমন্বিত পদ্ধতি সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে পারে।

    প্রান্তিক মানুষের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

    এই কর্মসূচির মৌলিক দর্শন হলো—দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সীমাবদ্ধতার ফল। ফলে প্রান্তিক মানুষকে সহায়তা করা দয়া নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনীতিতে একটি নৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে।

    বিশেষ করে ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার এবং আয়ক্ষম সদস্যহীন পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের সামাজিক সংবেদনশীলতার পরিচায়ক। এতে বোঝা যায়, এই কর্মসূচি কাগজে সুন্দর, বাস্তবে দুর্বল
    পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উৎসারিত।

    নারীকেন্দ্রিক রাষ্ট্রভাবনা: নীরব কিন্তু গভীর পরিবর্তন

    ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীপ্রধান ও অসহায় নারীনির্ভর পরিবারকে অগ্রাধিকার। বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা অভিবাসন-ফেরত নারীদের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সমাজ ও নীতিনির্ধারণ—উভয় ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত ছিল।

    এই কর্মসূচি তাদের কেবল আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে না; বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে দৃশ্যমান করে তুলছে। নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য বহুদিন ধরে শোনা গেলেও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ছাড়া সেই ক্ষমতায়ন কার্যত অর্থহীন ছিল। এখানে রাষ্ট্র সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিচ্ছে—যা একটি পরিণত রাষ্ট্রচিন্তার লক্ষণ।

    অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ভারসাম্য

    সমালোচনার একটি বড় জায়গা হলো এই কর্মসূচির ব্যয়ভার। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল ব্যয় কমানোর হিসাব নয়; বরং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিশ্চিত করার বিষয়। বিদ্যমান সহায়তা কর্মসূচিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থ সাশ্রয়ের পরিকল্পনা প্রমাণ করে যে সরকার দায়িত্বজ্ঞানহীন জনপ্রিয়তার রাজনীতি করছে না।

    বরং সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এটি দেখায়, কল্যাণরাষ্ট্র মানে অযৌক্তিক ব্যয় নয়; বরং পরিকল্পিত পুনর্বিন্যাস।

    স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নতুন দিগন্ত

    বাংলাদেশের সামাজিক সহায়তা
    ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল মধ্যস্থতাকারী নির্ভরতা। এতে একদিকে দুর্নীতি বেড়েছে, অন্যদিকে প্রকৃত উপকারভোগী বঞ্চিত হয়েছে। সরাসরি নগদ সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই পুরনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি নীতিগত অবস্থান।
    এতে করে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আস্থা পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে।

    অন্তর্ভুক্তির সীমারেখা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা

    জনপ্রিয়তা অর্জনের সহজ পথ হলো সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া। কিন্তু পরিণত রাষ্ট্রচিন্তা সেখানে সীমারেখা টানে। ‘কারা পাবেন না’—এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রশাসনিক দৃঢ়তার পরিচয় দেয়।

    একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে বাদ দেওয়া কিংবা বিদ্যমান সুবিধাভোগীদের সমন্বয়ের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত দেখায়, সরকার জনতুষ্টির চেয়ে নীতিগত শুদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

    ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন: অভিজ্ঞতাভিত্তিক রাষ্ট্রপরিচালনা

    সারা দেশে একযোগে কর্মসূচি চালু না করে নির্দিষ্ট কয়েকটি অঞ্চলে পরীক্ষামূলক প্রয়োগের সিদ্ধান্ত একটি বাস্তববাদী পথচলার ইঙ্গিত। এতে ত্রুটি শনাক্ত করা সহজ হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিমালা সংশোধনের সুযোগ থাকে।
    রাষ্ট্র পরিচালনায় এই ধৈর্য ও পরিমিতিবোধ দীর্ঘমেয়াদে সফলতার সম্ভাবনা বাড়ায়।

    বিএনপির রাজনৈতিক রূপান্তরের ইঙ্গিত

    দীর্ঘদিন ধরে বিএনপিকে আন্দোলনকেন্দ্রিক দল হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা ছিল। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সেই ধারণাকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি করছে। এটি দেখাচ্ছে, দলটি এখন নীতিনির্ভর, জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রপরিচালনার দিকে অগ্রসর হতে চায়।
    এই কর্মসূচি সফল হলে তা কেবল সরকারের নয়, বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

    পরিশেষে বলতে চাই—নতুন সরকারের সামনে এটি কেবল একটি সামাজিক কর্মসূচির প্রশ্ন নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রদর্শনের একটি বাস্তব পরীক্ষা।
    ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দারিদ্র্য দূর করার একমাত্র সমাধান নয়—এ কথা নতুন সরকারও জানে। তবে এই উদ্যোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়: রাষ্ট্র চাইলে কীভাবে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে পারে অনুগ্রহ নয়, অধিকারভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে। এটি দারিদ্র্যকে করুণার বিষয় না বানিয়ে ন্যায়বিচার ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন হিসেবে দেখার একটি অগ্রসর চিন্তা।
    নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই উদ্যোগকে যেন কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রাখা হয়। স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়ন, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং জবাবদিহির কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে এই কর্মসূচি ধীরে ধীরে আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। এতে শুধু দরিদ্র মানুষের জীবনমানই উন্নত হবে না, রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাসও শক্তিশালী হবে।
    যদি ধারাবাহিকতা, সদিচ্ছা ও নীতিগত দৃঢ়তা বজায় থাকে, তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তিতে রূপ নিতে পারে। তখন রাজনীতি আর শুধু ক্ষমতা দখল বা প্রতিশ্রুতির খেলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাজনীতি হয়ে উঠবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দৃশ্যমান, পরিমাপযোগ্য ও টেকসই পরিবর্তনের নাম।
    নতুন সরকারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত বিচার হবে এক প্রশ্নেই—এই রাষ্ট্র কি সত্যিই তার দুর্বলতম নাগরিকের পাশে দাঁড়াতে পেরেছে? ‘ফ্যামিলি কার্ড’ সেই পরীক্ষারই প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

    উপরের নিউজটি মাঠ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা এ বিষয়ে কোন দ্বিমত থাকলে প্রমাণসহ dailyswadhinshomoy@gmail.com এ ইমেইল করে আমাদেরকে জানান অথবা আমাদের +88 01407028129 নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ করুন।
    আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
    এই বিভাগের আরও খবর
     
    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    February 2026
    S M T W T F S
    1234567
    891011121314
    15161718192021
    22232425262728