রাজধানী ঢাকা ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিদেশে চাকরি ও ভিসা প্রসেসিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা করে আসা একটি চক্রকে ঘিরে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস, ত্রিধা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আশীর্বাদ স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি এবং আশীর্বাদ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরি, দ্রুত ভিসা প্রসেসিং এবং উন্নত সুযোগ–সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় অফিস বন্ধ করে আত্মগোপনে চলে যায়। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে নতুন তথ্য উঠে এসেছে—চক্রটি প্রকাশ্যে কার্যক্রম বন্ধ রাখলেও আড়ালে নতুন কৌশলে আবারও প্রতারণা শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
দৈনিক স্বাধীন সময়ের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে এই চক্রের সদস্যরা ফেসবুকে সরাসরি তেমন সক্রিয় না থাকলেও তারা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে পুরনো গ্রাহক ও নতুন আগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। সেখানে বিভিন্ন দেশে চাকরি, দ্রুত ভিসা প্রসেসিং এবং কম খরচে বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে আবারও অর্থ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আগে অফিসে বসেই টাকা নেওয়া হলেও বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অফিসে না ডেকে আশপাশের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট বা নির্জন স্থানে দেখা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেখানে বসেই টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই প্রতারণা চক্রের সঙ্গে জড়িত প্রধান ব্যক্তি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বিপ্লব ভট্টাচার্য, রনি, মাশুক ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি।
স্থানীয় সূত্রে বিপ্লব ভট্টাচার্যের পূর্ণ পরিচয় জানা গেছে—
বিপ্লব ভট্টাচার্য, পিতা: মৃত বিনয় ভুষণ ভট্টাচার্য, মাতা: দিপাভূষণ ভট্টাচার্য, জন্ম তারিখ: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২, স্থায়ী ঠিকানা: দক্ষিণ হীংজাগিয়া, ডাকঘর: হীংজাগিয়া–৩২৩০, কুলাউড়া, মৌলভীবাজার।
অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে পাঠানোর নামে অর্থ সংগ্রহের সময় তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন ব্যক্তি সরাসরি জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন রনি (মোবাইল: 01823-932792), মাশুক (মোবাইল: +8801672174905) এবং মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি (মোবাইল: 01799565570, 01799568090), পিতা: কালা মিয়া, গ্রাম: ছোট বহুলা, পোস্ট: রিচি–৩৩০০, হবিগঞ্জ সদর, হবিগঞ্জ।
ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব নম্বর ব্যবহার করেই বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল। বর্তমানে অধিকাংশ নম্বরই বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে নতুন সিম বা অন্য নম্বর ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বিদেশি চাকরির অফার দেওয়া হয় এবং কিছু সময় পরই সেই নম্বরগুলো বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, প্রথমদিকে মৌলভীবাজার জেলার কোর্ট রোড চৌমুহনা এলাকায় প্রাইম হার্ডওয়্যার–এর উপরে আশীর্বাদ স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি এবং আশীর্বাদ ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামে দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সেখানে অন্তত ২১ জন ব্যক্তির কাছ থেকে সার্বিয়ায় পাঠানোর কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রায় ৫ লক্ষ টাকা করে মোট প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরে মৌলভীবাজারে কার্যক্রম বন্ধ করে ঢাকায় এসে ত্রিধা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস নামে নতুন করে কার্যক্রম শুরু করা হয় বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোডের ট্রপিক্যাল মোল্লা টাওয়ার–এ এই প্রতিষ্ঠানের অফিস ছিল। তবে বর্তমানে সেই অফিস দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ত্রিধা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামেও আরেকটি প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়। পল্টনের শাওন টাওয়ার–এ কয়েক মাস অফিস পরিচালনার পর ভাড়া বকেয়া রেখে অফিস ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া পল্টন চায়না হাট সংলগ্ন একটি ভবনের ৫ম তলায় তানিয়া এয়ার ইন্টারন্যাশনাল–এর কাছ থেকে চেয়ার-টেবিল ভাড়া নিয়ে কয়েক মাস অফিস পরিচালনার পর প্রায় ৫ থেকে ৬ লক্ষ টাকা বকেয়া রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিদেশে পাঠানোর নামে সংগৃহীত অর্থের লেনদেনে মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মুতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের দাবি, সার্বিয়ায় পাঠানোর নামে সংগৃহীত প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার লেনদেন তার কাছেই জমা দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে কিছু কর্মচারী অভিযোগ করেছেন যে, কয়েক মাস কাজ করার পরও তারা কোনো বেতন পাননি। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। অনেকের দাবি, তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে বিদেশে পাঠানোর প্রতিশ্রুতির আড়ালে একটি বড় প্রতারণা চক্র কাজ করছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই ইতোমধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন এবং সম্মিলিতভাবে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। তাদের দাবি, দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের গ্রেপ্তার এবং আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার করা হোক।
এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
দৈনিক স্বাধীন সময় এ বিষয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।

