মোঃ মহিবুল্লাহ মেহেদী
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রতিনিধি, গাইবান্ধা
আজ ২৫শে মার্চ—বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক শোকাবহ, বিভীষিকাময় ও রক্তঝরা কালরাত্রি। ১৯৭১ সালের এই দিনে গভীর রাতে কোনো প্রকার ঘোষণা ছাড়াই ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় জাগ্রত বাঙালি জাতিকে দমিয়ে দিতে তারা শুরু করে ইতিহাসের এক নির্মম গণহত্যা।
অপারেশন সার্চলাইট: গণহত্যার নীলনকশা
১৯৭১ সালের মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে, তখন পাকিস্তানের সামরিক জান্তা আলোচনার আড়ালে প্রস্তুত করে গণহত্যার ভয়ংকর পরিকল্পনা। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয় ২৫শে মার্চ গভীর রাতে।
রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি সেনারা। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা (তৎকালীন ইপিআর সদর দপ্তর) এবং রাজারবাগ পুলিশ লাইনস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ-
২৫শে মার্চ রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চালানো হয় ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য ছাত্র ও শিক্ষককে হত্যা করা হয়।
এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে শহীদ হন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ড. জি. সি. দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ও অধ্যাপক মুনীরুজ্জামানের মতো দেশের গর্বিত সন্তানেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও প্রাঙ্গণ মুহূর্তেই পরিণত হয় বধ্যভূমিতে।
রাজারবাগ ও পিলখানায় বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ-
হানাদার বাহিনী যখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানায় আক্রমণ চালায়, তখন বাঙালি পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা সীমিত অস্ত্র নিয়েও সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল দিয়ে তারা আধুনিক ট্যাংক ও ভারী অস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। যদিও সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি, তবুও দেশপ্রেমিক পুলিশ সদস্যদের এই আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ হিসেবে ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
পুরান ঢাকায় অমানবিক তাণ্ডব-
হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা কেবল সামরিক স্থাপনা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে অগ্নিসংযোগ ও গুলিবর্ষণ করা হয়। নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ অসংখ্য নিরীহ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মুহূর্তেই জনবহুল এলাকা পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে।
গণহত্যার কালো অধ্যায়-
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২৫শে মার্চের রাতেই হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার মতে, কেবল ২৫শে মার্চের রাতেই বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাসে এটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশে দিনটি এখন ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়।
গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সেই কালরাত্রিতে শহীদ হওয়া সকল বীর বাঙালিকে। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

