আশুলিয়া প্রতিনিধি শরীফ মিয়া
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক শিক্ষার্থীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগে পুরো ক্যাম্পাসে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাতেই বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা। অভিযুক্ত পরিবহন ‘ঠিকানা পরিবহন’-এর একাধিক বাস আটক করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার (২৮ মার্চ) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক (ডেইরি গেট) সংলগ্ন ব্যস্ততম ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার সময় সড়কে যানবাহনের চাপ থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মামুন সরকার, জাবির রাজনীতি বিভাগের ৫৩তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। তিনি জানান, সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৪৫ মিনিটে বিশমাইল এলাকা থেকে ‘ঠিকানা পরিবহন’-এর একটি বাসে ওঠেন। বাসে ওঠার পর থেকেই হেলপারদের আচরণ ছিল অসৌজন্যমূলক। ডেইরি গেটে নামতে চাইলে বাসের হেলপার তার সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে বলে যে, “জাবির শিক্ষার্থীদের এই বাসে তোলা হবে না।”
মামুনের অভিযোগ, তিনি বিষয়টি শান্তভাবে সমাধানের চেষ্টা করলেও হেলপাররা আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে আরেকজন হেলপার তাকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এতে তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে হাঁটু, হাত ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পান। ঘটনাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনাও ঘটতে পারত বলে জানান তিনি।
ঘটনার পরপরই আশপাশের পথচারী ও সহপাঠীরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও মানসিকভাবে তিনি বেশ আতঙ্কিত রয়েছেন বলে সহপাঠীরা জানান।
এদিকে ঘটনার খবর ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়লে শত শত শিক্ষার্থী ডেইরি গেট এলাকায় জড়ো হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং কিছু সময়ের জন্য ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘ঠিকানা পরিবহন’-এর অন্তত ছয়টি বাস আটক করে এবং চালক-হেলপারদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতে বাসগুলো থানায় সোপর্দ করা হয়।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে কিছু পরিবহন শ্রমিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছে। অনেক সময় ভাড়া নিয়ে বিতর্ক, অযথা হয়রানি, এমনকি বাসে উঠতে না দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বিক্ষোভরত একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা বারবার নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আজকে আমাদের এক সহপাঠীকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছে—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।” তারা দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। আমরা ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলেছি। দোষীদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অপরদিকে পুলিশ জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আটক করা বাসগুলো জব্দ করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ।
এ ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও পরিবহন শ্রমিকদের আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে তারা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

