লেখক: (মুক্তমনা)
গত এক বছরে দেশে ৭১টি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং এ সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৬৪৫ বার হামলার তথ্য উঠে এসেছে। এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর। পরিসংখ্যানগুলো শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, যেখানে সকল নাগরিকের ধর্ম, মত ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে মুক্তমনা, নাস্তিক ও ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। শুধুমাত্র মত বা বিশ্বাস প্রকাশের কারণে সামাজিক নিপীড়ন, হুমকি, এমনকি প্রাণঘাতী সহিংসতার শিকার হওয়ার নজির রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অপব্যবহার এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতা এই সহিংসতাকে উৎসাহিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হামলার শিকার ব্যক্তিরাই সামাজিক চাপ বা ভয়ের কারণে আইনি সহায়তা নিতে পারছেন না। ফলে অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার পাশাপাশি ভিন্নমত প্রকাশকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ সহিংসতা ঘটেছে। মুক্ত চিন্তা বা সমালোচনামূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গণপিটুনি, সামাজিক বয়কট কিংবা প্রকাশ্য হুমকির ঘটনাও নতুন নয়।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা শুধু জনপ্রিয় মতের জন্য নয়, বরং অজনপ্রিয় ও সংখ্যালঘু মতের সুরক্ষাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা। মুক্তমনাদের ওপর হামলা কোনো একক গোষ্ঠীর সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের চিন্তার স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের প্রকাশিত পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, পরিস্থিতি আর উপেক্ষার পর্যায়ে নেই। শুধু নিন্দা বা বিবৃতি নয়, প্রয়োজন দ্রুত, কার্যকর ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা। একই সঙ্গে সামাজিকভাবে সহনশীলতা ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলাও জরুরি।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার নাগরিকদের কণ্ঠরোধে নয়, বরং নিরাপদভাবে কথা বলার নিশ্চয়তা দেওয়াতেই নিহিত। সংখ্যালঘু ও মুক্তমনা—উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

