নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের অনলাইন ট্রাভেল ব্যবসা বর্তমানে এক ভয়ঙ্কর প্রতারণার ঘটনায় তোলপাড়ের মুখে। আলোচিত প্রতিষ্ঠান ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল ঢাকা, ১৪অক্টোবর ২০২৫ হঠাৎ করেই কার্যক্রম বন্ধ করে, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কোম্পানিটি গ্রাহকদের কাছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিমান টিকিট, হোটেল বুকিং, হজ-প্যাকেজ এবং অন্যান্য ট্রাভেল সার্ভিসের নামে বিপুল অর্থ গ্রহণ করলেও কোনো সেবা দেয়নি। বাংলাদেশসহ প্রবাসি গ্রাহকরা তাদের টাকা ফেরতের জন্য হাহাকার করছেন। ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে আকর্ষণীয় ডিসকাউন্ট, সহজ রিফান্ড এবং বিশেষ প্যাকেজ দিয়ে গ্রাহকদের টাকার ফাঁদে ফেলে এবং পেমেন্ট নেওয়ার পর টিকিট বা সেবা প্রদান বন্ধ করে দেয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির অফিস বন্ধ, ওয়েবসাইট ও কল সেন্টার অচল হয়ে যায়, ফলে গ্রাহকরা সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগহীন হয়ে পড়েছেন।
অভিযোগ উঠেছে, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল ছাড়াও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফ্লাই ফার টেক, ফ্লাই ফার লেডিস ও ফ্লাই ফার ট্রিপ একযোগে প্রতারণার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সোশ্যাল মিডিয়া পেজে আকর্ষণীয় অফারের নামে গ্রাহকদের টাকা গ্রহণ করে আসছিল। তদন্তে জানা গেছে, ফ্লাই ফার গ্রুপ তাদের কর্মকাণ্ড চালাতে দুটি সুনামধন্য ট্রাভেল এজেন্সিকেও ব্যবহার করেছে— ভ্যালেন্সিয়া এয়ার ট্রাভেলস এন্ড ট্যুর লিমিটেড (প্যারামাউন্ট হাইট, দ্বিতীয় তলা, বক্স কালভার্ট রোড, পুরানা পল্টন, ঢাকা, ফোন: 01989925572) এবং ডায়নামিক ট্রাভেলস (বাশাতি হরাইজন, ৭ম তলা, এপ্টি # এ-৭, প্লট # ২১, রোড # ১৭, ব্লক # সি, বনানী সি/এ, ঢাকা-১২১৩, ফোন: +8802222274217, +8802 222276022 – 23)।
ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে সিইও নুসরাত জাহান আলী (০১৭৮৪৩৫৮৪১২), সিওও মেহেদি হাসান, এবং এজিএম সায়েদ সাদমান (০১৭৫৫৫৪৩৪৪৪)। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা প্রতিষ্ঠানটির ফান্ড এবং অনলাইন লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করতেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, যারা এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তারা এখন একত্রিত হয়ে যৌথ মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং সকল ক্ষতিগ্রস্তকে সঙ্গে নিয়ে এই মামলাটিকে সফল করতে চান। যারা এই মামলায় অংশ নিতে বা সহায়তা করতে চান, তারা ০১৪০৭০২৮১২৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
প্রতারণার শিকার গ্রাহকদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল তাদের ওয়েবসাইট, অ্যাপ এবং সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার ও ছাড়ের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করত। টাকা নেওয়ার পর গ্রাহকদের টিকিট না দেওয়ার পাশাপাশি রিফান্ড বা কনফার্মেশনের নামে দীর্ঘ সময় টালবাহানা করা হতো। কিছু গ্রাহক একাধিকবার অর্থ প্রদান করলেও সেবা পাননি। এই কেলেঙ্কারির কারণে দেশের অনলাইন ট্রাভেল সেক্টরের ওপর আস্থা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) জানিয়েছে, তারা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি অনলাইন ট্রাভেল ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই গ্রাহকদের অর্থ নিয়েছে, যা সরাসরি আইন লঙ্ঘন। CAAB জানিয়েছে, লাইসেন্স যাচাইয়ের পর প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স অবিলম্বে বাতিল বা স্থগিত করা হবে। প্রতিষ্ঠানটি আর কোনোভাবে টিকিট বিক্রি বা বুকিং করতে পারবে না এবং তাদের নাম ওয়েবসাইটে ব্ল্যাকলিস্টে প্রকাশ করা হবে। সিভিল এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে CID, CCB ও সাইবার ক্রাইম ইউনিটের মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। প্রমাণিত হলে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার এবং সম্পদ জব্দ করা হবে।
CAAB ইতিমধ্যে OTA (Online Travel Agency) নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিটি অনলাইন এজেন্সির শারীরিক অফিস ও যাচাইযোগ্য ট্রেড লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক, মাসিক বিক্রয় ও রিফান্ড রিপোর্ট জমা দেওয়া, অনলাইন পেমেন্টে মনিটরিং অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করা, প্রতিটি টিকিট ইস্যুর তথ্য CAAB সার্ভারে পাঠানোর জন্য API সংযোগ স্থাপন এবং ATAB ও IATA অনুমোদন ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না। এছাড়া গ্রাহক সুরক্ষা সেল চালু করা হবে, যেখানে ভুক্তভোগীরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন এবং CAAB প্রয়োজনে জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা টাকা ফেরতের নির্দেশ দিতে পারবে। প্রতারণাকারী এজেন্সির নাম সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। বিদেশে টাকা স্থানান্তর বা মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও BFIU-এর মাধ্যমে তদন্ত করা হবে। একটি বিশেষ Online Travel Audit Team (OTAT) গঠন করা হবে, যারা হঠাৎ অভিযান চালিয়ে অনলাইন এজেন্সির অনুমোদন, ওয়েবসাইট, গ্রাহক ফেরত ব্যবস্থা যাচাই করবে। OTA সেক্টরকে Tourism Business Regulation Act-এর আওতায় আনা হবে, লাইসেন্স নবায়নের সময় Tax Clearance Certificate বাধ্যতামূলক করা হবে এবং অনলাইন ট্রাভেল লেনদেনের ওপর VAT ও ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্টিং কার্যকর হবে।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনালের প্রতারণা দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা (প্রতারণা), ৪০৬ ধারা (বিশ্বাসভঙ্গ) এবং সাইবার সিকিউরিটি আইন ২০২৩-এর আওতায় বিচারযোগ্য। প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, এটি বাংলাদেশের অনলাইন ট্রাভেল খাতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। সঠিক আইন প্রয়োগ, ডিজিটাল মনিটরিং এবং গ্রাহক সচেতনতা ছাড়া ভবিষ্যতে এমন প্রতারণা রোধ করা সম্ভব নয়। ভুক্তভোগীরা এখন “প্রতারিত টাকার ফেরত এবং ন্যায়বিচার” কামনা করছেন।

