উখিয়া উপজেলা প্রতিনিধি | রেজাউল করিম
২০১২ সাল ও বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিশাল শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় নতুন করে যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে, তা স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে—
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘নতুন ভোটাররা’ কি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে?
স্থানীয়দের ক্ষোভ ও আশঙ্কা
উখিয়া ও টেকনাফের বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরে এলাকায় জনসংখ্যার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হয়েছে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের ওপর বাড়তি চাপ পড়েছে।
একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন,
“গত সরকারের আমলে অনেক রোহিঙ্গা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে নানা উপায়ে নিজেদের নথিভুক্ত করেছে বলে শোনা যায়। এখন ভোটের মৌসুম ঘনিয়ে আসায় আমরা আতঙ্কিত— যদি তারা ভোট দেয়, তাহলে স্থানীয় মানুষের অধিকার কোথায় থাকবে?”
আরেক বাসিন্দার মন্তব্য,
“এখন এমন অবস্থা, একটা সন্তান জন্ম দেওয়া যতটা না কষ্টকর, তার চেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকা।”
রোহিঙ্গাদের আইনি অবস্থান কী?
বাস্তবতা হলো— বাংলাদেশে জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে ভোট দিতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী ভোটার তালিকায় নাম থাকা বাধ্যতামূলক।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বর্তমানে যেসব পরিচয়পত্র বহন করছে
ক্যাম্প রেজিস্ট্রেশন কার্ড,
বায়োমেট্রিক তথ্যভিত্তিক শরণার্থী সনদ,
অথবা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রদত্ত পরিচয়পত্র—
এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের নাগরিকত্বের প্রমাণ নয় এবং এগুলোর ভিত্তিতে কেউ জাতীয় নির্বাচনে ভোটার হওয়ার সুযোগ পায় না।
নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী
নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী—
ভোটার হতে হলে জন্মসূত্রে বা আইন অনুযায়ী বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে।
স্থায়ী ঠিকানা ও জাতীয় পরিচয়পত্র থাকতে হবে।
ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হলে কোনোভাবেই ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।
রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এই শর্তগুলোর কোনোটিতেই পড়ে না। ফলে ক্যাম্পের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
গুঞ্জনের পেছনে কী?
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী মৌসুম এলেই নানা ধরনের গুজব ছড়ায়। রোহিঙ্গাদের মতো সংবেদনশীল ইস্যুকে সামনে এনে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করাই এসব অপপ্রচারের মূল লক্ষ্য।
রোহিঙ্গারা মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রিত হলেও তারা বাংলাদেশের নাগরিক নয় এবং জাতীয় বা স্থানীয় কোনো নির্বাচনে তাদের ভোট দেওয়ার অধিকার নেই।
তবুও ‘রোহিঙ্গা ভোটার’ নিয়ে নতুন করে ছড়ানো গুজব উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়াচ্ছে।
এখন সময়— গুজবে কান না দিয়ে প্রকৃত তথ্য জানা এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করা।

