সাইফুল আলম হিরন, জেলা প্রতিনিধি,’ফেনী:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যত ঘনিয়ে আসছে;ততই ফেনীতে নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে শঙ্কা বাড়ছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুথানে ফেনীতে ব্যবহার করা হয়েছে শতাধিক ভারী অস্ত্র ও প্রাণঘাতি বুলেট। ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের আঘাতে জেলার মহিপালে ঝরেগেছে ১২টি তাজা প্রাণ।
সেসব অস্ত্রের ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হলেও মাত্র একটি অস্ত্র ছাড়া বাকী অস্ত্রগুলো উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃংখলা বাহিনী।কেবল সেসব অবৈধ অস্ত্রই নয়; পুলিশের ৭টি অস্ত্রও এখনো উদ্ধার হয়নি।যা থানা থেকে লুট হয়েছিল ২৪’র ৫ আগস্ট।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এসব অস্ত্র হুমকি হলে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক ও সাধারণ মানুষ। এদিকে পুলিশ অস্ত্রের সন্ধান দিতে পুরষ্কার ঘোষণা করেও কোনো সুফল মিলেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সাথে কথা বলে জানাগেছে ২০২৪ সালে ৪ আগস্ট যেসব অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে; সেসব অস্ত্রধারীরা সবাই:পতিত সরকারের অস্ত্রধারী কর্মী/ক্যাড়ার। সেদিন প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে ছাত্র-জনতার উপর। এই অস্ত্রের প্রাণঘাতি বুলেটে মারা যায় শ্রাবণ, মাসুদ,শিহাব, শাকিব, শাহী,কাউসার, সবুজসহ ১১ জন।
এসব ভারী অস্ত্রের মাত্র একটি ছাড়া বাকী অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃংখলা বাহিনী। এসব ভারী অস্ত্রের সাথে যুক্ত হয়েছে থানা থেকে লুট হওয়া ৫টি পিস্তল ও ২টি শটগান। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এসব অস্ত্র হুমকি হবে বলে মনে করছেন ফেনীর রাজনৈতিক নেতারাও।
পুলিশের হিসেবে জুলাই গণহত্যায় অংশ নেওয়া
অস্ত্রধারী ও অস্ত্র ছিল ২৫টি। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি এর সংখ্যা শতাধিক।
প্রায় ১৭ মাস পরও এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছেন জুলাই আন্দোলনে শহীদের পিতা-মাতারা। তাদের আক্ষেপ যে অস্ত্র কেড়ে নিয়েছে তাদের সন্তানদের জীবন; সে অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি কেন? এমন আক্ষেপ জুলাই যোদ্ধাদেরও।
জুলাই অভ্যুথানে নিহত শহীদ ইশতিয়াক আহমদ শ্রাবণের পিতা নেছার আহমদ বলেন, যেসব অস্ত্র আমাদের ছেলেদের বুকে চালিয়েছে হায়েনারা। সেসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে আগামীতে অন্যের বুক খালি হবে।তাই এসব অস্ত্র ও অস্ত্রধারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, জুলাই-আগস্টে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি লাইসেন্সকৃত অস্ত্রও ব্যবহার হয়েছে। অভ্যুথানের পর পালিয়ে থাকা নেতারা বিভিন্ন থানায় ৯৫ টি অস্ত্র জমা দিলেও ফেনীর পতিত গডফাদার সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারী ও তার স্ত্রী নুর জাহান বেগম তাদের পিস্তল ও রাইফেল জমা দেননি।
এছাড়া নিজাম হাজারীর সেকেন্ড ইন কমান্ড ফেনী সদরের ফাজিলপুর ইউনিয়নের মজিবুল হক রিপন, ছনুয়ার রেঞ্চু করিম (করিম উল্যাহ) ও সোনাগাজীর মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন এর শটগান ও পিস্তল জমা দেয়নি এখনও। এদিকে অস্ত্র ও অস্ত্রধারীদের ধরতে ফেনীর পুলিশ সুপার ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকার পুরষ্কার ঘোষণা করেও কোনো পায়নি।
ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ফেনীতে আমরা যেসব অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার দেখেছি তার সামান্য অংশও উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র উদ্ধার ছাড়া নির্বাচন করলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হতে পারে।তাই নির্বাচনের আগে অস্ত্র উদ্ধার করা জরুরী।
ফেনী জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক আনম আবদুর রহীম বলেন, ৪ আগস্টে ব্যবহৃত সব ভারী অস্ত্র এখনো ফেনীতে আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচনে সংঘাত খুনোখুনি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।যৌথ বাহিনীর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধার করা হোক।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে ফেনী শহরের এক বাসিন্দা জানান, ফেনী শহরের মাস্টার পাড়ার পুকুর, ফেনীর রাজাঝির দিঘীসহ আশপাশের পুকুরগুলোতে অবৈধ অস্ত্র থাকতে পারে। কারণ ৪ আগস্ট যারা এসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে। ৫ আগস্ট তারা পালিয়ে গেছে। অস্ত্রগুলো সরাতে পারেনি।
ইসলামী আন্দোলনের ফেনী জেলা সাধারণ সম্পাদক একরামুল হক ভূঁইয়া জানান, সাধারণ ভোটাররা অস্ত্র দেখলে ভয় পাবে। অস্ত্র প্রদর্শন করে কেউ কেন্দ্র দখল করলে ভোটের চিত্র পাল্টে যাবে।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান ও ফেনী-২ আসনের সাংসদ সদস্য প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, অবৈধ অস্ত্র ভোটের জন্য বড় হুমকি। অবৈধ অস্ত্র থাকলে কেন্দ্র দখল হবে, ভোট ডাকাতি হবে। অনতিবিলম্বে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হোক।
ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম বলেন, মহিপালে ২৫টি অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে। সেখান থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। থানা থেকে ৩৩ টি অস্ত্র লুট হয়েছে। সেখান থেকে ২৬টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে। গত ৫ আগস্টের পর পর বন্যা হওয়ার কারণে; এ সুযোগটি কাজে লাগিয়ে অস্ত্রগুলো অন্যত্র সরিয়ে ফেলা হতে পারে। এছাড়া এসব অস্ত্র নির্বাচনে যাতে ব্যবহার না হয় সেজন্য পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে।
অন্যদিকে রোববার (১১ জানুয়ারি) জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে
সহসাই যৌথবাহিনী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান পরিচালনা করবে বলে জানানো হয়েছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হকের সভাপতিত্বে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাকারিয়ার সঞ্চালনায় উক্ত সভায় পুলিশ সুপার মো.শফিকুল ইসলাম, সেনাবাহিনীর ফেনী সদর ক্যাম্পের ইনচার্জ মেজর রায়হান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

