ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান—একটি গুরুত্বপূর্ণ, অথচ অনেক সময় অবহেলিত মাস। এই মাসই আমাদেরকে নিয়ে যায় পবিত্র রমজানের দোরগোড়ায়। আর শাবান মাসের প্রথম জুমা যেন সেই আগাম ডাক—নিজেকে জাগ্রত করার, অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার এবং রমজানের জন্য মানসিক ও আত্মিক প্রস্তুতি নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ।
শাবান মাসের গুরুত্ব: কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে
যদিও কোরআনে সরাসরি শাবান মাসের নাম উল্লেখ নেই, তবে আল্লাহ তাআলা সময় ও মাসের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন—নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারো—আল্লাহর কিতাবে, যেদিন তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।”(সুরা আত-তাওবা: ৩৬) এই বারো মাসের মধ্যেই শাবান একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, কারণ এটি রমজানের প্রস্তুতির মাস।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে অন্য যেকোনো নফল রোজার তুলনায় বেশি রোজা রাখতেন। উসামা ইবনে জায়েদ (রা.) বলেন—আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি আপনাকে শাবান মাসের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখি না। তিনি বললেন, এটি এমন এক মাস, যা রজব ও রমজানের মাঝখানে পড়ে; মানুষ এ মাসকে অবহেলা করে। অথচ এ মাসেই আমলসমূহ আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আমি চাই, আমার আমল এমন অবস্থায় পেশ হোক, যখন আমি রোজাদার। (সুনান আন-নাসাঈ: ২৩৫৭)
শাবান মাসের প্রথম জুমা: কেন বিশেষ?
জুমা নিজেই সাপ্তাহিক ঈদ। আর যখন এই জুমা আসে শাবানের শুরুতে, তখন এর তাৎপর্য আরও গভীর হয়। এটি আমাদের জন্য একটি আত্মসমালোচনার মুহূর্ত—আমি কি রমজানের জন্য প্রস্তুত?
আল্লাহ তাআলা বলেন—হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে নেয় সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে। (সুরা আল-হাশর: ১৮)
শাবানের প্রথম জুমা যেন এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন-আগামী দিনের (রমজান ও আখিরাত) জন্য আমরা কী প্রস্তুতি নিচ্ছি, তা ভেবে দেখার সময়।
এই জুমার প্রধান বার্তা: প্রস্তুতি ও তওবা
শাবান মাসের প্রথম জুমা আমাদেরকে তিনটি বিষয়ের দিকে
বিশেষভাবে ডাক দেয়—
১. খাঁটি তওবা ও আত্মশুদ্ধি
রমজানের আগে অন্তরকে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। গুনাহের বোঝা নিয়ে রমজানে প্রবেশ করলে সেই রমজানের পূর্ণ বরকত পাওয়া কঠিন।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন_প্রত্যেক আদম সন্তানই গুনাহ করে, আর গুনাহকারীদের মধ্যে উত্তম তারা, যারা তওবা করে।”
(সুনান ইবন মাজাহ: ৪২৫১)
২. আমলের অভ্যাস গড়ে তোলা
শাবান মাসে অল্প অল্প করে আমলের অভ্যাস তৈরি করলে রমজানে তা সহজ হয়—নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও দান-সদকা। আয়েশা (রা.) বলেন—নবী (সা.) এমনভাবে রোজা রাখতেন যে, আমরা বলতাম—তিনি আর রোজা ছাড়বেন না; আবার কখনো এমন হতো যে, আমরা বলতাম—তিনি আর রোজা রাখবেন না।(সহীহ বুখারি: ১৯৬৯)
৩. সম্পর্ক ও হক আদায়
শাবান হলো সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মাস। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার অন্তরে রেখে রমজানের পূর্ণ রহমত লাভ করা যায় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—প্রতি
সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দাদের আমল পেশ করা হয়। তখন আল্লাহ সব মুমিনকে ক্ষমা করে দেন, তবে তাদের নয়—যাদের অন্তরে হিংসা আছে; তাদের বলা হয়, পরস্পর মীমাংসা না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করো।”(সহীহ মুসলিম: ২৫৬৫)
শাবান থেকে রমজান: একটি সেতুবন্ধন
শাবান মাসের প্রথম জুমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—রমজান হঠাৎ করে আসে না। এটি আসে প্রস্তুতির হাত ধরে। যে ব্যক্তি শাবানে নিজেকে গুছিয়ে নেয়, তার রমজান হয় ফলপ্রসূ, শান্তিময় ও বদলে যাওয়ার রমজান। হাসান বসরি (রহ.) বলতেন—শাবান হলো কোরআনের মাসের চাষাবাদ; আর রমজান হলো ফসল তোলার সময়।
পরিশেষে বলতে চাই, শাবান মাসের প্রথম জুমা কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একটি আত্মিক সংকেত। আল্লাহ আমাদেরকে আরেকটি রমজান দেখানোর সুযোগ দিচ্ছেন—এটাই সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সুযোগের জন্য প্রস্তুত?আসুন, এই জুমায় আমরা দৃঢ় নিয়ত করি—গুনাহ ছেড়ে দেব, আমলে ফিরব, সম্পর্ক ঠিক করব এবং এমন একটি রমজানের দিকে এগোব, যা আমাদের জীবন বদলে দেবে।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবানের বরকত ও রমজানের পূর্ণ রহমত লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

