প্রতিবেদক: আরিফ আজাদ
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এপস্টেইন ফাইলস’—একাধিক সাক্ষ্য, তদন্তসংক্রান্ত নথি এবং আদালত-উৎসের বিবৃতি নিয়ে গঠিত একটি বিশদ দলিল। সেখানে উঠে এসেছে এমন সব নাম, যাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। এই তালিকার তথ্যগুলো এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও প্রভাবক শ্রেণির নৈতিক অবস্থান নিয়ে।
কারা উঠে এসেছেন এই নথিতে?
প্রকাশিত আদালত-উৎসের নথিতে বিভিন্ন সময়ে এপস্টেইনের সঙ্গে যোগাযোগ, সফর বা সম্পর্কের প্রসঙ্গে কিছু পরিচিত ব্যক্তির নাম এসেছে—যার মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিক, রাজপরিবারের সদস্য, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী বিজ্ঞানী ও হলিউড ব্যক্তিত্ব।
এই নামগুলো অভিযোগ–প্রক্রিয়ায় উল্লেখিত সাক্ষ্য বা নথির দাবি মাত্র; সবার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি—এটি আদালত-নথিতে নিজেই উল্লেখ আছে।
নোট (তথ্য যাচাই):
**কিছু নাম এসেছে সফর, পরিচয় বা যোগাযোগের প্রসঙ্গে;
অপরাধে প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার অভিযোগ সবার ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়।**
নৈতিকতা বনাম বাস্তবতা: ভণ্ডামির বড় চিত্র
এই বিতর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো—অনেক নাম সেই ব্যক্তিদের, যারা জনসমক্ষে মানবাধিকার, নারী অধিকার, শিশুর সুরক্ষা ও বিশ্বশান্তির গল্প বলেন।
কিন্তু আদালতে উঠে আসা বিবৃতিগুলো যখন ক্ষমতাসীনদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তোলে, তখন গড়ে ওঠে গভীর আস্থাসংকট।
মূল তিনটি সংকট
১. প্রভাবশালীদের দায়বদ্ধতার অভাব:
ক্ষমতাই অনেকে মনে করেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকার লাইসেন্স। এই মানসিকতা সমাজে জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল করে।
২. দ্বিচারিতার সংস্কৃতি:
মঞ্চে নৈতিকতার মশাল, কিন্তু অন্ধকারে বিতর্কিত সম্পর্ক—এই বৈপরীত্যই মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেয়।
৩. মূল্যবোধের অবক্ষয়:
যে সমাজে রোল মডেলরাই প্রশ্নবিদ্ধ হন, সেখানে তরুণদের নৈতিক দিশা ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনিবার্যভাবেই।
ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট: এপস্টেইন ঘটনা কীভাবে শুরু? (সংক্ষিপ্ত টাইমলাইন)
২০০০–এর দশক: অপ্রাপ্তবয়স্কদের শোষণের অভিযোগ ওঠে।
২০০৮: প্রথম দফায় বিচার ও শাস্তি।
২০১৯: নতুন করে ফেডারেল অভিযোগে গ্রেপ্তার।
২০১৯: কারাগারে মৃত্যুর পর প্রশ্ন ও বিতর্ক বেড়ে যায়।
২০২৪–২০২৫ থেকে: আদালতের সিল খোলা নথি প্রকাশ পেতে শুরু করে; বিভিন্ন নাম আলোচনায় আসে।
বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা
‘এপস্টেইন ফাইলস’ প্রমাণ করেছে—ক্ষমতার আড়ালে অনেক সময় এমন বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে যা সমাজের মূল নৈতিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়।
বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—
ব্যক্তি নয়, সিস্টেমের দায় নির্ধারণ করা এবং যেসব অন্ধকার কাঠামো এমন অপরাধকে বহু বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে, সেগুলোকে ভেঙে ফেলা।
উপসংহার
মানবতার কথা বলা সহজ; সে মানবতার মানদণ্ডে টিকে থাকা সবচেয়ে কঠিন।
এপস্টেইন-সংক্রান্ত নথিগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাজকে বিচার করতে হবে আবেগ দিয়ে নয়, প্রমাণ, জবাবদিহি ও আইনের সমান প্রয়োগ দিয়ে।
বিশ্বব্যাপী যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে এখন দরকার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সর্বোপরি সমাজের কাছে দায়বদ্ধতা।

