• আজকের পত্রিকা
  • ই-পেপার
  • আর্কাইভ
  • কনভার্টার
  • অ্যাপস
  • সবার আগে বাংলাদেশ : ইশতেহারের রাজনীতি ও দায়বদ্ধতা 

     swadhinshomoy 
    07th Feb 2026 5:44 pm  |  অনলাইন সংস্করণ Print

    ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

    জাতীয় নির্বাচন কেবল ভোটের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির, শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের পরীক্ষার মুহূর্ত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, তা নিছক প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়; বরং এটি একটি দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও সামাজিক ন্যায়ের রূপরেখা হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য।
    সবার আগে বাংলাদেশ” এই মূলমন্ত্রের আলোকে প্রণীত ইশতেহার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে জনগণের কাছে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে এই প্রতিশ্রুতিগুলো মানুষকে পুনরায় বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।

    সুশাসন ও আইনের শাসন

    ইশতেহারের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হলো দুর্নীতি নির্মূল, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার। বিএনপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে—রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা ছাড়া উন্নয়ন স্থায়ী হবে না। স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন গঠন করে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দলটির গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।

    ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি সেবায় জিরো টলারেন্স নীতি, এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করে—বিএনপি ক্ষমতায় গেলে লুটপাট নয়, ন্যায্যতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই হবে শাসনের মূলনীতি। ফ্যাসিবাদী আমলের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের অঙ্গীকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং ন্যায়বিচারের ও ইতিহাসের দায় পূরণের দৃঢ় প্রমাণ।

    গণতন্ত্র পুনর্গঠন

    বিএনপি ইশতেহারে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মূল ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি, নির্বাচনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন দলটির গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারকে দৃঢ় করে।

    দলটি বিশ্বাস করে—প্রতিটি নাগরিকের ভোটের মর্যাদা, রাজনৈতিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি হবে না। এই উদ্দেশ্যে ইশতেহার রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক দায়িত্বকে সমান্তরালভাবে তুলে ধরে।

    অর্থনীতি পুনরুদ্ধার : উচ্চাভিলাষ ও বাস্তবতা

    ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দুতে অর্থনীতি অবস্থান করছে। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী, তবে এটি দেশকে উৎপাদনমুখী ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্রে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতির প্রকাশ।

    শিল্পায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণ এবং স্টার্টআপ সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে বিশদভাবে দেওয়া হয়েছে। করব্যবস্থায় সংস্কার, ব্যবসা লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক অবকাঠামো উন্নয়ন লক্ষ্যশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

    তরুণ ও কর্মসংস্থান

    বিএনপি বিশ্বাস করে—দেশের শক্তি তার তরুণ সমাজ। ইশতেহারে তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশ, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং বৈশ্বিক ই-কমার্সের সঙ্গে সংযুক্তকরণ যুবসমাজকে উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত করবে।

    দলটি স্পষ্টভাবে বলেছে—শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি নয়, বরং বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী করে এবং উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন করে টেকসই কর্মসংস্থান সম্ভব।

    সামাজিক সুরক্ষা : ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড

    ইশতেহারের সবচেয়ে মানবিক অংশ হলো সামাজিক সুরক্ষা। ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের পরিবারকে মাসিক নগদ সহায়তা বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের প্রস্তাব, মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে মানুষকে স্থিতিশীল জীবনধারায় সাহায্য করবে।
    ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সার, বীজ, সেচ সুবিধা, সহজ ঋণ, কৃষিবীমা এবং বাজারজাতকরণের নিশ্চয়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তিতে দাঁড় করাতে সহায়ক। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বিকল্প শক্তি হিসেবে বিবেচনা করাও দেশের অর্থনৈতিক বহুমাত্রিকতার নির্দেশ দেয়।

    শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি

    শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার অগ্রাধিকার, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ডিজিটাল ল্যাব, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা—এই উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য সমন্বিত প্রস্তুতি।
    স্বাস্থ্য খাতেও এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও উপজেলায় হাসপাতালের মানোন্নয়ন, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করার প্রতিশ্রুতি জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার বার্তা দেয়।

    জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক বার্তা

    ইশতেহারে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধ এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনে জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। বিএনপির বক্তব্য অনুযায়ী, জুলাই সনদের অধিকাংশ বিষয় তাদের ঘোষিত ৩১ দফার মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত। এটি দলটির রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ।

    পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন

    ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নদী-খাল পুনঃখনন, বৃক্ষরোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত।

    ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহায়তা

    বিএনপি ইশতেহারে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনদের ভাতা প্রদান, ধর্মীয় নেতাদের প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ এবং সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার—এগুলো একটি নৈতিক ও সমন্বিত সমাজ গড়ে তোলার উদ্যোগ। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেশের সামাজিক সামঞ্জস্যকে শক্ত করবে।

    বাস্তবতা বনাম প্রতিশ্রুতি

    বিএনপির ইশতেহার একটি সমন্বিত উন্নয়ন দর্শন তুলে ধরে—গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সামাজিক ন্যায় একসঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এত বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।

    বাজেট, মানবসম্পদ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা ছাড়া এই কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তবে বিএনপির প্রতিশ্রুতি এবং জনমতের প্রতি দায়বদ্ধতা একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করতে পারে।

    পরিশেষে বলতে চাই, সব মিলিয়ে বিএনপির ইশতেহার একটি কল্যাণমুখী, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বচ্ছ রূপরেখা তুলে ধরেছে। এটি জনগণের সামনে স্পষ্ট বার্তা দেয়—ভয় নয়, অধিকার; লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা।আজকের বাংলাদেশ পরিবর্তনের অপেক্ষায়। বিএনপির ইশতেহার সেই পরিবর্তনের পথনকশা। জনগণের রায়ে দায়িত্ব পেলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নেবে—এই আস্থা দলটির রাজনীতির মূল শক্তি। “সবার আগে বাংলাদেশ” কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার।

    উপরের নিউজটি মাঠ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা এ বিষয়ে কোন দ্বিমত থাকলে প্রমাণসহ dailyswadhinshomoy@gmail.com এ ইমেইল করে আমাদেরকে জানান অথবা আমাদের +88 01407028129 নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ করুন।
    আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
    এই বিভাগের আরও খবর
     
    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    February 2026
    S M T W T F S
    1234567
    891011121314
    15161718192021
    22232425262728