ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বাংলাদেশের রাজনীতি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মূহুর্তে। এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে, আর প্রতিটি রাজনৈতিক দল জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য তাদের ইশতেহার ঘোষণা করছে। ইশতেহার কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, এটি দেশের ভবিষ্যত কৌশল, রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার এবং জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে, যেখানে নারী, যুবক, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কারের দিকগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নারীর নিরাপত্তা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা
জামায়াতের ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো নারীদের কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা। দলটির আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, “আমরা চাই নারীরা সন্তান হওয়ার পরও চাকরি হারাতে না হয়। এজন্য মাতৃত্বকালীন সময়ে স্বেচ্ছানুযায়ী কর্মঘণ্টা পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত হ্রাস করা হবে। এটি নারীর অধিকার ও সম্মান রক্ষার একটি পদক্ষেপ।” যদিও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা হয়েছে, দলটি বলেছে, এটি নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া বাস্তব পদক্ষেপ।
শফিকুর রহমান আরও জানিয়েছেন, “আমরা বেকারভাতা নয়, বাস্তব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য হলো চা শ্রমিকের সন্তানও একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবে।” এই প্রতিশ্রুতি মূলত দেশের যুবক ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, যারা কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশ।
অগ্রাধিকারে ২৬টি বিষয়
জামায়াতের ইশতেহারে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারে ২৬টি বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো মূলত সততা, শৃঙ্খলা, সামাজিক নিরাপত্তা, সুশাসন এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে। তাছাড়া ৪১ দফার বিস্তারিত পরিকল্পনায় রয়েছে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, দক্ষ ও ইনসাফভিত্তিক প্রশাসন এবং যুবক ও নারীর ক্ষমতায়ন।
দেশের ভেতরে এবং বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সাত কোটি যুবকের জন্য প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। বিদেশ যাত্রার জন্য আন্তঃসরকার চুক্তি, কম খরচে যাত্রা এবং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে কর্মসংস্থানের পথ সুগম করা হবে।
শ্রমিক ও নারী নিরাপত্তা
ইশতেহারে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হবে। নারীদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মঘণ্টা হ্রাস, সরকারি চাকরিতে আবেদন ফি বাতিল এবং সকল ধরনের বৈষম্য দূরীকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই বিষয়গুলো বিশেষভাবে নারী ও যুবক ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।
শিক্ষা খাতের সংস্কার
জামায়াতের ইশতেহারে শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক ও সমন্বিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও গবেষকের সমন্বয়ে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। শিক্ষা বাজেট জিডিপির ছয় শতাংশে উন্নীত করা হবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক অনুদান প্রদান করা হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রথম দুই সেমিস্টারের ফি সরকার বিনা সুদে প্রদান করবে।
মাদ্রাসা শিক্ষায় বৈষম্য দূরীকরণ, ইবেতদায়ি মাদ্রাসাকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সমতুল্য করা এবং কওমি শিক্ষার সিলেবাসে সংস্কার করার পরিকল্পনা রয়েছে। নারীর শিক্ষা উন্নয়নের জন্য বিনা বেতনে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন কাঠামোতে সংস্কার এবং শিক্ষাক্রম আধুনিকায়নও পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত।
স্বাস্থ্য খাতের অগ্রাধিকার
স্বাস্থ্য খাতে পাঁচ বছরের কম ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ বৃদ্ধি, প্রতিটি জেলায় পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। উন্নত ও কম খরচে চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবার সমানুপাতিক বিতরণ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সুশাসন
জামায়াতের ইশতেহারে দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ ও চাঁদাবাজিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন, সকল পর্যায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। সমানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা জোরদার করা এবং সুষ্ঠু নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন, মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং অতীতে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় হওয়া খুন, গুম ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের পুনর্বিবেচনা করা হবে।
অর্থনীতি ও শিল্পায়ন
জামায়াত প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ, শিল্পায়ন, কৃষি ও উৎপাদন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূরীকরণ, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ, বিনামূল্যে আবেদন এবং ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে।
শ্রমিকদের মজুরি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, নারীর নিরাপদ কাজের পরিবেশ এবং প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প বিকাশ এবং ভারী শিল্পে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ
স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনের মাধ্যমে সুখী ও সমৃদ্ধ কল্যাণ-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবেশ, বর্জ্য ও বন্যা ঝুঁকি কমানো, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আবাসন সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিরাপদ কর্মজীবন নিশ্চিত করা হবে।
এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ইশতেহারের প্রভাব
এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রকাশিত এই ইশতেহার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শ্রমিক, নারী, যুবক এবং সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নারীর নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বিতর্কিত হলেও রাজনৈতিক সংলাপ ও ভোটাধিকারকে প্রভাবিত করার হাতিয়ার।
ইশতেহার বাস্তবায়নযোগ্যতা, জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রতিশ্রুতির কার্যকরী বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। যদিও নির্বাচনী ইশতেহার সবসময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়, তবুও এটি জনমতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
পরিশেষে বলতে চাই, জামায়াতের এই ইশতেহার দেখায়, কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, এটি রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার ও সামাজিক অগ্রগতির দিকেও নজর রাখে। নারীর অধিকার, যুবক ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সুশাসন—সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক প্রস্তাব। এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ইশতেহারটি ভোটারের কাছে একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নযোগ্য কি না এবং জনগণ এ বিষয়ে কতটা আস্থা রাখতে পারে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই হবে এই ইশতেহারের মূল পরীক্ষার মাপকাঠি।

