উত্তাল জনতার বিচার (Mob Justice) আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি গুরুতর আইনগত ও নৈতিক অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।
কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে, আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে উত্তেজিত জনতা যখন কাউকে অপদস্থ, হেনস্থা বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করে- তখন সেটিই উত্তাল জনতার বিচার। এটি কেবল একটি ব্যক্তির ওপর সহিংসতা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় আইনের কর্তৃত্ব, মানবাধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।
অন্যদিকে, আন্দোলনকে সাধারণত গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দাবি আদায়, প্রতিবাদ জানানো কিংবা কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক ও সামাজিক মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—যখন কোনো অপরাধমূলক আচরণ আন্দোলনের ব্যানারে সংঘটিত হয়, তখন সেটি কি আর অপরাধ থাকে, নাকি আন্দোলনের ছাতার নিচে গিয়ে বৈধতা পায়?
এই প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই mob justice ও আন্দোলনের মধ্যকার সীমারেখা নতুন করে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
উত্তাল জনতার বিচার: সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য:-
উত্তাল জনতার বিচার বলতে সাধারণত বোঝায়,
অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করা,
আদালতের রায় বা আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই শাস্তি প্রদান,
গুজব, আবেগ ও ক্ষোভের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ,
অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দেওয়া,
এই প্রক্রিয়া আইনত দণ্ডনীয় এবং মৌলিক মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এখানে জনতাই বিচারক, জনতাই সাক্ষী, জনতাই কার্যকরকারী। ফলে ভুল, প্রতিশোধ কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য নিরীহ মানুষও প্রাণ হারাতে পারে।
আন্দোলন: উদ্দেশ্য ও বাস্তব রূপ:-
আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত-
দাবি আদায়ের জন্য শান্তিপূর্ণ চাপ সৃষ্টি,
রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ,
নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি উত্থাপন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়ই ভিন্ন- বহু আন্দোলনে দেখা যায়, রাস্তাঘাট অবরোধ করে সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি,
ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রকাশ্যে অপমান ও হেনস্থা,
ভিন্নমত দমন বা ভয় দেখানো।
এই পর্যায়ে আন্দোলন তার নৈতিক উচ্চতা হারাতে শুরু করে এবং প্রশ্ন ওঠে:- এটি কি আদৌ গণতান্ত্রিক থাকছে?
আন্দোলনের আড়ালে অপরাধ: বৈধতার প্রশ্ন
একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো:-
যে কাজটি একক ভাবে করলে অপরাধ, সেটিই যদি “আন্দোলন”-এর অংশ হিসেবে ঘটে, অনেক সময় তা সামাজিক বা রাজনৈতিক বৈধতা পেয়ে যায়।
উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়- সামান্য ইস্যুতে রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেওয়া, কোনো ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা,
উত্তেজিত জনতার চাপে কাউকে কথা বলার সুযোগ না দেওয়া। এই কাজগুলো যদি আন্দোলনের ব্যানারে ঘটে, তবে কি সেগুলো আর অপরাধ থাকে না? নাকি আমরা কেবল ব্যানার বদলে অপরাধকে গ্রহণযোগ্য করে তুলি?
পঞ্চগড়ের ঘটনা: ব্যক্তিগত স্মৃতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা
প্রায় ২৭–২৮ বছর আগে পঞ্চগড় ইউনিয়নের হেলিপোট নামক স্থানে সংঘটিত একটি মব জাস্টিসের ঘটনা আজও মনে পড়ে। সে সময় আমি প্রথমবারের মতো উত্তাল জনতার বিচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচার করেছিলাম।
গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তি ছিলেন আমিনার- একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত বহুরূপী। তাঁর বাড়ি পঞ্চগড় পৌরসভার ঘাটিয়াপাড়া মহল্লায়। অভিযোগের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই উত্তেজিত জনতা তাঁকে হত্যা করে।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো- এত বছর পরও সেই মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান সুরাহা পাওয়া যায়নি। এই ঘটনা কেবল একজন আমিনারের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার প্রতীক।
আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মবের শিকার মানুষ হয়। কোথাও আইনের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না, আবার কোথাও আন্দোলনের নামে এসব ঘটনাকে আড়াল করে ফেলা হয়। ফলে প্রশ্ন জাগে- আন্দোলনের নামে সংঘটিত এই সহিংসতাগুলো কি আদতে mob justice নয়?
বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট:-
সাম্প্রতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার একটি বড় আন্দোলন সংঘটিত হয়। এই আন্দোলন ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে—
যদি কোনো আন্দোলন আইনগত স্বীকৃতি বা নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে না থাকে, তবে তা কি সম্পূর্ণ নির্দোষ?
আন্দোলনের সময় যদি ব্যক্তি-লক্ষ্যভিত্তিক চাপ, অপমান বা শাস্তিমূলক আচরণ চলে, তবে সেটি কতটা ন্যায়সংগত?
পঞ্চগড়ে মবের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়েছে, সেখানেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য! আন্দোলনের নামে যদি কাউকে একঘরে করা, সামাজিক ভাবে অপদস্থ করা, বা চাপ প্রয়োগ করা হয়- তবে সেটি mob justice থেকে কতটা আলাদা?
বিশ্লেষণ: – একই মুদ্রার দুই পিঠ!
তাত্ত্বিকভাবে mob justice ও আন্দোলন আলাদা। কিন্তু বাস্তব আচরণে বহু ক্ষেত্রে এই পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়।
যখন,
জনতাই বিচারক হয়ে ওঠে এবং
দাবি আদায়ের নামে শাস্তিমূলক আচরণ চলে-
আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষিত হয়, তখন আন্দোলন কার্যত উত্তাল জনতার বিচারের রূপ ধারণ করে।
এখানে সমস্যাটি আন্দোলন নয়; সমস্যাটি হলো, আইনের বিকল্প হিসেবে জনতার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা।
উপসংহার:-
উত্তাল জনতার বিচার ও আন্দোলন তাত্ত্বিকভাবে ভিন্ন হলেও বাস্তব প্রয়োগে বহু ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। আন্দোলন যদি দাবি আদায়ের সহায়ক ভূমিকার বাইরে গিয়ে শাস্তি আরোপের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে সেটি আর নৈতিক বা গণতান্ত্রিক থাকে না।
অতএব, আন্দোলনের নামে সংঘটিত প্রতিটি কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে আনা জরুরি।
কারণ- আইনের বাইরে গিয়ে কোনো কাজ, ব্যানার বদলালেই ন্যায়সঙ্গত হয়ে যায় না।
এম, আব্দুল আউয়াল পঞ্চগড় জেলা

