ইসলাম কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের ধর্ম নয়; বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা। নেতৃত্ব নির্বাচন ও ক্ষমতা প্রদান ইসলামের দৃষ্টিতে একটি শরয়ী আমানত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোট সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে এই আমানত অর্পিত হয়। তাই ভোট দেওয়া বা না দেওয়া—উভয়ই ঈমানী জবাবদিহিতার বিষয়।
১. নেতৃত্ব ও ক্ষমতা একটি মহা আমানত
📖 কুরআনের দলিল
سورة النساء: ٥٨
إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا وَإِذَا حَكَمۡتُم بَيۡنَ ٱلنَّاسِ أَن تَحۡكُمُواْ بِٱلۡعَدۡلِۚ إِنَّ ٱللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِۦٓۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ سَمِيعَۢا بَصِيرًا
অর্থ:
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—তোমরা আমানতসমূহ তার প্রকৃত হকদারের নিকট পৌঁছে দাও এবং যখন মানুষের মাঝে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।
🔹 ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন:
এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত সব ধরনের কর্তৃত্ব, বিচার ও শাসনক্ষমতা।
(তাফসীর আল-কুরতুবী, ৫/২৫৬)
➡️ ভোটের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিকে ক্ষমতায় পৌঁছানো এই আয়াতের স্পষ্ট খেলাফ।
২. অযোগ্যকে ক্ষমতায় বসানো কিয়ামতের আলামত
📜 হাদিসের পূর্ণ নস
সহিহ বুখারি, হাদিস: ٥٩
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَتَى السَّاعَةُ؟ قَالَ: إِذَا ضُيِّعَتِ الْأَمَانَةُ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ. قَالَ: كَيْفَ إِضَاعَتُهَا؟ قَالَ: إِذَا وُسِّدَ الْأَمْرُ إِلَى غَيْرِ أَهْلِهِ فَانْتَظِرِ السَّاعَةَ
অর্থ:
যখন দায়িত্ব অযোগ্য ব্যক্তির হাতে অর্পণ করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।
➡️ ভোটের মাধ্যমে অযোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা সরাসরি এই সতর্কবার্তার বাস্তব রূপ।
৩. ন্যায়পরায়ণ শাসকের মর্যাদা
📜 সহিহ হাদিস
সহিহ বুখারি: ٦٦٠ | সহিহ মুসলিম: ١٠٣١
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ… إِمَامٌ عَادِلٌ
অর্থ:
সাত শ্রেণির মানুষ কিয়ামতের দিন আল্লাহর আরশের ছায়ায় থাকবে… তাদের একজন হলো ন্যায়পরায়ণ শাসক।
➡️ ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে ভোট দেওয়া আখিরাতমুখী কাজ।
৪. ভোট হলো সাক্ষ্য — মিথ্যা সাক্ষ্য কবিরা গুনাহ
📖 কুরআন
سورة الحج: ٣٠
فَٱجۡتَنِبُواْ ٱلرِّجۡسَ مِنَ ٱلۡأَوۡثَٰنِ وَٱجۡتَنِبُواْ قَوۡلَ ٱلزُّورِ
📜 হাদিস
সহিহ বুখারি: ٢٦٥٤
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟ … قَوْلُ الزُّورِ وَشَهَادَةُ الزُّورِ
➡️ টাকা বা স্বার্থের বিনিময়ে ভুল প্রার্থীকে ভোট দেওয়া মিথ্যা সাক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত।
৫. শূরা ও জনসম্পৃক্ততা ইসলামের নীতি
📖 কুরআন
سورة الشورى: ٣٨
وَأَمۡرُهُمۡ شُورَىٰ بَيۡنَهُمۡ
🔹 ইমাম ইবন কাসীর (রহ.) বলেন:
শূরা রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি।
(তাফসীর ইবন কাসীর, ٤/١٢٢)
➡️ আধুনিক ব্যবস্থায় ভোট শূরারই একটি গ্রহণযোগ্য রূপ।
৬. জালিমদের সমর্থন করা হারাম
📖 কুরআন
سورة هود: ١١٣
وَلَا تَرۡكَنُوٓاْ إِلَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ فَتَمَسَّكُمُ ٱلنَّارُ
➡️ ভোটের মাধ্যমে জালিম ও ইসলামবিদ্বেষীদের ক্ষমতায় আনা এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
৭. নেতৃত্ব নির্বাচনের কুরআনিক মানদণ্ড
📖 কুরআন
سورة القصص: ٢٦
إِنَّ خَيۡرَ مَنِ ٱسۡتَأۡجَرۡتَ ٱلۡقَوِيُّ ٱلۡأَمِينُ
দুটি শর্ত:
القوي – যোগ্যতা ও সক্ষমতা
الأمين – তাকওয়া ও বিশ্বস্ততা
শেষ কথা
ভোট ইসলামের দৃষ্টিতে নিছক রাজনৈতিক কাজ নয়—এটি আমানত, সাক্ষ্য ও দায়িত্ব।
সঠিক ভোট হতে পারে ইবাদত, আর ভুল ভোট হতে পারে জবাবদিহির কারণ।
আজকের সঠিক সিদ্ধান্তই আগামীর ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রথম ধাপ।

