ডা.মু মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বাংলাদেশের এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র, শাসনব্যবস্থার নৈতিকতা এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক চাপের প্রেক্ষাপটে জনগণ আজ কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রত্যাশা করছে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহার ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার দলিল হিসেবেই বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত ইশতেহার দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন ও অগ্রাধিকারের প্রতিনিধিত্ব করলেও উভয় দলই গণতন্ত্র, সুশাসন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ইশতেহার দুটি মূলত জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের চেষ্টা—যা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপি: গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার
সবার আগে বাংলাদেশ”—এই মূলমন্ত্রে প্রণীত বিএনপির ইশতেহার মূলত রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি রাজনৈতিক রূপরেখা। দলটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা নয়, বরং একটি সংস্কারমূলক রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবেও উপস্থাপন করেছে।
সুশাসন ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। দুর্নীতি নির্মূল, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রতিশ্রুতি দলটির গণতান্ত্রিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে। স্বাধীন ও কার্যকর নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং মানবাধিকার কমিশন গঠনের অঙ্গীকার বিএনপির ভাষায় উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
ন্যায়পাল নিয়োগ, সরকারি সেবায় জিরো টলারেন্স নীতি এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনার ঘোষণা শাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের অঙ্গীকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও ইতিহাসের দায় পূরণের বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রশ্নে বিএনপি বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভোটাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতাকে উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করে দলটি নির্বাচনব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট দূর করার অঙ্গীকার করেছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিএনপির ইশতেহার উচ্চাভিলাষী। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। শিল্পায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সম্প্রসারণ এবং স্টার্টআপ সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতির কথা বলা হয়েছে।
তরুণ সমাজকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে কারিগরি শিক্ষা, ভাষা দক্ষতা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারে প্রবেশের পরিকল্পনা ইশতেহারে গুরুত্ব পেয়েছে। দলটি স্পষ্ট করেছে—শুধু সরকারি চাকরিনির্ভর অর্থনীতি নয়, বরং শক্তিশালী বেসরকারি খাতই টেকসই কর্মসংস্থানের ভিত্তি।
সামাজিক সুরক্ষায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালুর প্রস্তাব বিএনপির মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে বিনামূল্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, ই-হেলথ কার্ড চালু এবং ব্যাপক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগও ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জামায়াত: নৈতিক রাষ্ট্র, নারী ও যুবককেন্দ্রিক রাজনীতি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার মূলত নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে প্রণীত। নারী, যুবক, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নকে দলটি রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে রেখেছে।
ইশতেহারে নারীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, মাতৃত্বকালীন সময়ে কর্মঘণ্টা হ্রাস এবং বৈষম্যহীন নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাব রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও নারী ভোটারদের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে। দলটির দাবি, এসব উদ্যোগ নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে আরও টেকসই করবে।
যুবকদের ক্ষেত্রে জামায়াত বেকারভাতা নয়, বাস্তব কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দিয়েছে। সাত কোটি যুবকের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান এবং ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত। আন্তঃসরকার চুক্তি, কম খরচে বিদেশযাত্রা এবং সহজ ঋণের প্রস্তাব প্রবাসী শ্রমবাজার সম্প্রসারণের দিক নির্দেশ করে।
শিক্ষা খাতে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন, জিডিপির ছয় শতাংশ বাজেট বরাদ্দ এবং মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষার বৈষম্য দূর করার পরিকল্পনা রয়েছে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক অনুদান, বিনা সুদে বিদেশি শিক্ষার সহায়তা এবং নারীদের জন্য বিনা বেতনে উচ্চশিক্ষার প্রস্তাব দলটির সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে।
স্বাস্থ্য খাতে শিশু ও প্রবীণদের বিনামূল্যে চিকিৎসা, জেলা পর্যায়ে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন এবং স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কারে সমানুপাতিক নির্বাচন, শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকার, চাঁদাবাজিমুক্ত প্রশাসন এবং অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড পুনর্বিবেচনার ঘোষণা জামায়াতের সংস্কারবাদী অবস্থান নির্দেশ করে।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফাঁক: আস্থা ও সক্ষমতার পরীক্ষা
দুটি ইশতেহারই জনগণের হতাশা ও প্রত্যাশাকে লক্ষ্য করে তৈরি।বিএনপি যেখানে গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় পুনরুদ্ধারের ভাষা ব্যবহার করেছে, সেখানে জামায়াত নৈতিক রাষ্ট্র ও সামাজিক ভারসাম্যের কথা বলেছে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়—এই প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন বিপুল আর্থিক সম্পদ ও দক্ষ প্রশাসন। রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এই লক্ষ্য অর্জনকে জটিল করে তুলেছে। তাই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক রোডম্যাপ থাকা জরুরি।
প্রশাসনিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতাও বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল ঘোষণায় নয়, বাস্তব চর্চায় প্রমাণ করতে হবে। ক্ষমতায় গিয়ে বিরোধী মত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতি আচরণ কেমন হবে—এটাই জনগণের প্রকৃত উদ্বেগ।
সামাজিক খাতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য। নারী ও যুবকদের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। একইভাবে বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়াতে কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তব ব্যবস্থাপনা জরুরি।
এই নির্বাচন তাই প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাজনৈতিক চরিত্র, সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা।
পরিশেষে বলতে চাই,এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিএনপি ও জামায়াতের ইশতেহার ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করলেও উভয় দলই রাষ্ট্র সংস্কার, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়ের কথা বলছে। শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ই নির্ধারণ করবে—কোন ইশতেহার কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, আর কোনটি রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তব নীতিতে রূপ নেবে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও মানুষের মর্যাদা—এই তিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াই হবে যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন।

