ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক প্রয়োজন নয়; এটি দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করার, নাগরিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ সুগম করার একটি বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যুত্থান–পরবর্তী অনিশ্চয়তা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন হচ্ছে দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র–জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে মৌলিক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার অবসানের পর জনগণ নতুন ধরনের সরকার, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং স্বচ্ছ প্রশাসনের আশা রাখে। অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল—ন্যায়, অংশগ্রহণ এবং বৈষম্যহীন সমাজ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সত্য হলো—যেকোনো গণ–অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। পুরনো দ্বন্দ্ব নতুন রূপ নেয়, রাজনৈতিক অনৈক্য প্রকট হয়, এবং সহিংসতার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ভোটার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বাস্তবতা
নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে মোট নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। পুরুষ ও নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় সমান, এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটাররাও তালিকাভুক্ত। এই বিপুল ভোটার সংখ্যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শক্তি প্রদর্শন করে। তবে, অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ভোটারদের আস্থা এবং নিরাপত্তা অপরিহার্য।
এই নির্বাচনে ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। দলীয় ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে সহস্রাধিক প্রার্থী দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীর উপস্থিতি একটি ইতিবাচক দিক, যা প্রমাণ করে—মানুষ শুধু দল নয়, বরং ব্যক্তিগত প্রতিভা ও নেতৃত্বের ভিত্তিতেও প্রতিনিধিত্ব চায়। দলের প্রচারণা, মঞ্চসভা, মিডিয়া কার্যক্রম এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ কেবল রাজনৈতিক মনোরঞ্জন নয়; এটি তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করে এবং নির্বাচনের গুরুত্ব বোঝায়।
প্রার্থী নির্বাচন, তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সামাজিক অবদান এবং স্থানীয় জনমতের সাথে সমন্বয়—এসব বিষয় ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, এই নির্বাচন কেবল সরকারের গঠনের উপায় নয়, এটি নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যম হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্যুত্থান–পরবর্তী চ্যালেঞ্জ
৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক অনৈক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং প্রতিহিংসার রাজনীতি। অতীতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, এই ধরনের পরিস্থিতি নির্বাচনী সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ায়।
নির্বাচনী পরিবেশে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে—কোথাও প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ, কোথাও হুমকি বা উত্তেজনা, আবার কোথাও বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর। সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারী ও প্রবীণ ভোটাররা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নির্বাচনী সহিংসতা কেবল প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি করে না; এটি ভোটারদের মনে ভয় তৈরি করে, ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কমায়, এবং
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
ভোটার আস্থা পুনঃস্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক ভোটার এখনও নিশ্চিত নয়—তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে কি না, তারা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে কি না। এই আস্থা পুনঃস্থাপন না করলে ভোটার উপস্থিতি কমবে এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়বে।
দায়িত্ব ও করণীয়
এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দায়িত্ব সর্বাধিক তিন পক্ষের ওপর—নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দলগুলো।
প্রথমত, নির্বাচন কমিশনকে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ ও শক্ত অবস্থানে থাকতে হবে। শুধু ঘোষণায় নয়, বাস্তব পদক্ষেপে তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণিত হতে হবে।
ভোটগ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ণত নিরপেক্ষ ও পেশাদার হতে হবে। ভোটার, প্রার্থী এবং নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কোনো ধরনের পক্ষপাত বা অতিরিক্ত বল প্রয়োগ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
তৃতীয়ত, রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিযোগিতা যেন সহিংসতা বা ভয়ভীতির রূপ না নেয়। বিজয় বা পরাজয়—উভয়েই সংযম ও সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। পারস্পরিক সমঝোতা এবং শান্তিপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে পারলে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।
ভোটার মনোবিজ্ঞান ও প্রত্যাশা
ভোটাররা আশা করে, তাদের ভোট সঠিকভাবে গণনা হবে, নিরাপদভাবে কেন্দ্রে পৌঁছানো যাবে এবং কোনো ধরনের হুমকি–ভীতি ছাড়া ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে গ্রামের মানুষ, শহরের মধ্যবিত্ত এবং নারী ভোটাররা নিরাপত্তা ও স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি রাখে।
নির্বাচনের দিন শুধু ভোটগ্রহণ নয়; এটি মানুষকে গণতান্ত্রিক সচেতনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং দেশের ভবিষ্যৎ ভাবনার সুযোগ দেয়। ভোটারদের আত্মবিশ্বাস পুনঃস্থাপন এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা নির্বাচনের মূল চ্যালেঞ্জ।
গণতন্ত্রের বড় পরীক্ষা
এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় গণতান্ত্রিক পরীক্ষা। এটি দেখাবে—দেশ কি সত্যিই সংঘাত ও প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরতে পেরেছে কিনা।
শুধু সরকারের গঠন নয়, নির্বাচন প্রমাণ করবে—গণতন্ত্র কতটা জনমুখী, কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা স্থিতিশীল। এই নির্বাচনের সাফল্য বা ব্যর্থতা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য দিকনির্দেশনা হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এটি সংঘাত–সহিংসতা মুক্ত, অংশগ্রহণমূলক এবং বিশ্বাসযোগ্য হলে কেবল সরকার গঠনের প্রক্রিয়া হবে না; এটি গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার ভিত্তিও হবে। ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের চেতনা ছিল—ন্যায়, নিরাপত্তা এবং অংশগ্রহণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে সেই চেতনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সুযোগ এসেছে। এখন সময় এসেছে দায়িত্বশীলতা, সংযম এবং ঐক্যের মাধ্যমে প্রমাণ করার—বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে দৃঢ়ভাবে এগোতে প্রস্তুত।

