ডা. মু মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক চেতনা ও ভবিষ্যৎ পথনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন তেমনই একটি অধ্যায়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা, আস্থার সংকট এবং অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—পরিবর্তন চাই। সেই পরিবর্তনের নেতৃত্বে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
এই নির্বাচন দেশের রাজনীতিকে নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে নেওয়ার সংকেত দিয়েছে। এটি শুধুমাত্র একটি দলের জয় নয়; এটি জনগণের দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার সারাদেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, গড়ে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তবে একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু এবং চট্টগ্রাম-২ ও চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকায়, ২৯৭ আসনের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
ফলাফলের সারসংক্ষেপ:
বিএনপি: ২০৯ আসন, জামায়াতে ইসলামি : ৬৮ আসন,জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): ৬ আসন,
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ: ১ আসন,খেলাফত মজলিস: ৩ আসন
,গণ অধিকার পরিষদ: ১ আসন,গণসংহতি আন্দোলন: ১ আসন,স্বতন্ত্র প্রার্থী: ৭ আসন,
এই ফলাফল সংসদে রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও ভিন্নমতের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
ভোটার অংশগ্রহণ ও পরিসংখ্যান
মোট প্রতিদ্বন্দ্বী: ৫০টি রাজনৈতিক দল ও ২,০২৮ জন প্রার্থী (নারী প্রার্থী ৮৩ জন, স্বতন্ত্র ২৭৩ জন)
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯,পুরুষ ভোটার: ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪,নারী ভোটার: ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫,হিজড়া ভোটার: ১,২২০,ডাকযোগে ভোট পড়েছে ৮০.১১ শতাংশ, বৈধ ভোটের হার ৭০.২৫ শতাংশ।ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শহর ও পার্শ্বনগর এলাকায় ভোটার উপস্থিতি বেশি। গ্রামাঞ্চলেও অংশগ্রহণ স্পষ্ট, যা রাজনৈতিক সচেতনতার সারাদেশিক বিস্তার নির্দেশ করে।
নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু: তারেক রহমান
বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয়ের পেছনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে প্রত্যাবর্তন, নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় নেতৃত্ব প্রদর্শন এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন বিএনপিকে নতুন করে প্রাণবন্ত করেছে।
তার নেতৃত্বে: * দলীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা * তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ * ভবিষ্যতমুখী রাজনৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়ন।
রোডম্যাপের মূল কেন্দ্রবিন্দু: গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তার নেতৃত্ব যুবসমাজ ও নারীদের মধ্যে নতুন আশা ও আস্থা সৃষ্টি করেছে।
ভোটের বিশ্লেষণ: ‘না’ ভোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর বার্তা
কিছু আসনে উল্লেখযোগ্য ‘না’ ভোট ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।স্বতন্ত্র প্রার্থীর জয় (৭ আসনে) প্রমাণ করে যে ভোটাররা দল নয়, নীতি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি গণতন্ত্রের পরিপক্বতার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
গণভোটের চূড়ান্ত ফলাফল
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটেও জনগণের মনোভাব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে: হ্যাঁ’ ভোট: ৬৮.০৬% (৪,৮০,৭৪,৪২৯ ভোট)
না’ ভোট: ৩১.৯৪% (২,২৫,৬৫,৬২৭ ভোট) ফলাফল প্রকাশ করে যে, জনগণ পরিবর্তনের পক্ষে সুস্পষ্ট সমর্থন দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বিএনপির বিজয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে:
* BBC: দীর্ঘ সময় পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
Reuters: ‘ভূমিধস জয়’, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ-নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
* CNN: দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ধারায় বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
* চীন: নির্বাচন সুষ্ঠু ও সফল বলে অভিনন্দন জানিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা।
* ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতা: তারেক রহমানকে অভিনন্দন বার্তা পাঠান।
* যুক্তরাষ্ট্র: বিএনপির বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে, সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার অভিন্ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ।এই প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
অর্থনীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনা
নতুন সরকারের প্রধান দায়িত্ব:
* প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
* অর্থনৈতিক পুনর্গঠন: বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, অবকাঠামো, কৃষি ও রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবন
* সামাজিক সেবা সম্প্রসারণ ও নাগরিক সুবিধার অনলাইনীকরণ
* জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দল ও স্বতন্ত্রদের সঙ্গে সংলাপ
* আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সরকারকে প্রাথমিকভাবে এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই মনোযোগ দিতে হবে। বিশেষ করে করোনা পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প, কৃষি ও রপ্তানি খাত পুনরুজ্জীবন জরুরি।
পরিশেষে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা, প্রশাসনিক একপক্ষীয়তা এবং জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ভোটের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। বিএনপি এককভাবে ২০১১ আসনে জয়ী হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী শক্তি থেকে সরকার গঠনের সক্ষম নেতৃত্বে রূপান্তরিত হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন, যা প্রমাণ করে ভোটাররা দল নয়, নীতি ও যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, গড়ে ৫৯.৪৪ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। শহর ও পার্শ্বনগর এলাকায় অংশগ্রহণ বেশি, তবে গ্রামাঞ্চলেও পরিবর্তনের স্রোত স্পষ্ট। নারী ভোটার ও যুবসমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশব্যাপী রাজনৈতিক সচেতনতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপক্বতার দিক নির্দেশ করে।
বিএনপির ঐতিহাসিক বিজয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাসে থাকার পর দেশে প্রত্যাবর্তন, নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় নেতৃত্ব এবং সাংগঠনিক পুনর্গঠন দলের ঐক্য ও কার্যকারিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। তার নেতৃত্ব গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সুশাসনের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। BBC, Reuters, CNN ও আল জাজিরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তনের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র নবগঠিত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এটি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল দেশীয় রাজনীতিতে নয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
নতুন সরকারের মূল দায়িত্ব হলো গণতান্ত্রিক চর্চা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ নতুন সম্ভাবনার মুখোমুখি। এই সম্ভাবনাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সত্যিকার অর্থে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

