এম আব্দুল আউয়াল
সাংবাদিকতা একসময় ছিল মানুষের আস্থা, ন্যায় ও সত্যের প্রতীক। এই পেশার মূল শক্তি নিরপেক্ষতা, সততা ও সাহসিকতায় নিহিত। প্রকৃত সাংবাদিকতা কখনো কোনো দল, গোষ্ঠী বা বিশেষ স্বার্থের কাছে দায়বদ্ধ নয়; বরং তা দায়বদ্ধ থাকে জনগণের কাছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, – কলমের শক্তি বহু অত্যাচারী ও স্বৈরশাসকের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে। সত্য প্রকাশের নির্ভীক চর্চাই সাংবাদিকতাকে মহান পেশার মর্যাদা দিয়েছে।
নৈতিক অবক্ষয়ের বাস্তবতা
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশার একাংশে নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্রও দৃশ্যমান হয়েছে।
কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পবিত্র পরিচয়কে ব্যবহার করছেন ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে। কখনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়া, কখনো অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে আপস, আবার কখনো প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনা মানুষের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
এর ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে শুধু ব্যক্তি নয়, পুরো পেশাটিই।
প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ব্যক্তির দায়
গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের বিশ্বাস গড়ে ওঠে দীর্ঘ সময়ের নিষ্ঠা ও দায়িত্ব শীলতার মাধ্যমে। GTV, Independent Television (আইটিভি) এবং NTV-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংবাদ পরিবেশনের ধারাবাহিকতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগত অসততার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অনৈতিক কাজ করেন, তবে তার ক্ষতি কেবল ব্যক্তিগত সীমায় থাকে না; বরং পুরো গণমাধ্যম অঙ্গনের বিশ্বাসযোগ্যতাই আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
তথ্যপ্রবাহের যুগে দায়িত্বশীলতা
বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু প্রকৃত সাংবাদিকতার দায়িত্ব কেবল সংবাদ প্রচার নয়; বরং তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। গুজব বা অপপ্রচার এড়িয়ে চলা, তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা, এসবই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ।
একটি ভুল বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ শুধু একজন ব্যক্তিকেই নয়, একটি পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রতিটি সংবাদ পরিবেশনের আগে প্রয়োজন গভীর নৈতিক সচেতনতা ও পেশাগত দায়বদ্ধতা।
আত্মসমালোচনা ও শুদ্ধতার পথ
যে কোনো পেশার মতো সাংবাদিকতাও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে শুদ্ধ হতে পারে। ভুল স্বীকার করার সাহস এবং তা সংশোধনের আন্তরিক প্রচেষ্টা একটি গণমাধ্যমকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। স্বচ্ছ নীতিমালা, জবাবদিহি এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক তথ্য যাচাই পদ্ধতির ব্যবহার এবং নৈতিক মানদণ্ডের চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মালিকপক্ষেরও উচিত বাণিজ্যিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে সংবাদকর্মীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ সৃষ্টি করা।
আশার আলো
সব সংকটের মাঝেও সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেক সাংবাদিক নিষ্ঠা, সততা ও সাহসিকতাকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবাধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির অগ্রগতিও সাংবাদিকতাকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। ডেটা বিশ্লেষণ, মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদকে আরও গতিশীল ও প্রভাবশালী করে তুলছে।
উপসংহার
তবু শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের বিবেক ও নৈতিকতায়। সত্যের প্রতি অটল প্রতিশ্রুতি, নিরপেক্ষ অবস্থান এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতাই সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। ব্যক্তি নয়, নীতিই হোক পথপ্রদর্শক-এই প্রত্যয়ে এগিয়ে চললেই সাংবাদিকতা তার মহত্ত্ব অটুট রাখতে সক্ষম হবে।

