আন্তর্জাতিক:
“এবার বিশেষভাবে চীনা নববর্ষের উৎসবমুখর পরিবেশ উপভোগ করতেই এসেছি,” সদ্য চীনে প্রবেশ করা মঙ্গোলিয়ার এক পর্যটক উচ্ছ্বাস লুকাতে না পেরে বললেন। বসন্ত উৎসবের ‘চুনলিয়ান’ বা শুভবাণী লেখা লাল কাগজ দরজায় লাগানো, নববর্ষের পারিবারিক নৈশভোজ এবং মন্দিরমেলা ঘোরা,সবকিছুরই অভিজ্ঞতা তিনি নিতে চান। এ বছর তাঁর মতো চীনে এসে বসন্ত উৎসব উদযাপন করতে আগ্রহী বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বসন্ত উৎসবকালীন বিমান টিকিট বুকিং গত বছরের তুলনায় চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে সংখ্যাগত বৃদ্ধির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো গুণগত পরিবর্তন। ‘চায়না ট্রাভেল’ এখন ২.০ যুগে প্রবেশ করেছে,একবারের ‘চেক-ইন ভ্রমণ’ থেকে তা রূপ নিচ্ছে নিমগ্ন ও ‘গভীর অভিজ্ঞতা’নির্ভর যাত্রায়। এই আপগ্রেড বা উত্তরণের পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক ও সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ। এগুলো বিদেশি পর্যটকদের চীনে ভ্রমণ ও কেনাকাটার অসুবিধা ধীরে ধীরে কমিয়েছে এবং চীনকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আরও দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিচ্ছে।
দুই কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সাংহাইয়ের নানজিং পশ্চিম সড়ককে গড়ে তোলা হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাশন কনজাম্পশন জোন’ বা কেনাকাটার কেন্দ্র হিসেবে। আরও বেশি ঐতিহ্যবাহী ব্র্যান্ড ও দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ড কর ফেরত বা ‘ট্যাক্স রিফান্ড’ নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে, যা চীনা ব্র্যান্ডকে বিশ্বমুখী করছে। বর্তমানে নানা পেমেন্ট সুবিধাকরণ নীতির ফলে বিদেশি ব্যাংক কার্ড ব্যবহারের কভারেজ ৯৫ শতাংশেরও বেশি। ‘কিনলেই ফেরত’ ধরনের ট্যাক্স রিফান্ড সেবা কেনাকাটার প্রক্রিয়াকে করেছে আরও মসৃণ।
২০২৫ সালে ট্যাক্স রিফান্ড নেওয়া বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তিন গুণ বেড়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পণ্যের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানের কেনাকাটার পরিবেশ গড়ে তোলা, ইনবাউন্ড-বান্ধব বাণিজ্যিক এলাকা তৈরি ও বিদেশি পেমেন্ট সেবা উন্নত করা,এই পদক্ষেপগুলোর ওপর গত জানুয়ারিতে চীনা রাষ্ট্রীয় পরিষদের জারি করা ‘সেবা খাতের ব্যয়ের নতুন প্রবৃদ্ধির পয়েন্ট ত্বরান্বিত করার কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক দলিলে আবারও জোর দেওয়া হয়েছে। করমুক্ত নীতির আকর্ষণ ক্রমেই আরও বেশি ইনবাউন্ড ‘ট্রাফিক’ বা পর্যটক প্রবাহকে বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধিতে রূপান্তর করছে।
ব্যয়ের খাতের বহুমাত্রিক সম্প্রসারণ
এই কর্মপরিকল্পনায় বিদেশি পর্যটকদের ব্যয়ের ক্ষেত্র জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চমানের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্ট, পারফরম্যান্স, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং আবাসনভিত্তিক ভ্রমণ ও স্বাস্থ্যসেবার ব্র্যান্ড গড়ে তোলা।
হাইনানের সানয়ায় শুধু নীল সমুদ্র আর আকাশই নেই; রাশিয়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা আইরিনা এখন ইয়ালং উপসাগরের একটি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে তিন সপ্তাহের চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। তাঁর মতে, এখানে চীনা আকুপাংচারের খরচ রাশিয়ার তুলনায় অনেক কম এবং চিকিৎসকদের কৌশলও বেশ খাঁটি। পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও থেরাপি থেকে শুরু করে ভেষজ খাদ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সেবা পাওয়া যায়।
ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর সংযোগ
দেশজুড়ে বহু পর্যটনস্থলে বহুভাষিক সাইনবোর্ড যুক্ত হয়েছে। চাংচিয়াচিয়ে পর্যটন এলাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক হাজার জনের বেশি বিদেশি ভাষায় পারদর্শী গাইড; আর স্মার্ট অনুবাদ প্রযুক্তিও বড় ভূমিকা রাখছে। ভাষাগত বাধা দূর হলেই আরও গভীর সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া সম্ভব হয়।
সহজেই কল্পনা করা যায়, ‘চীনে কাটানো এক সত্যিকারের চীনা নববর্ষ’ বিদেশি পর্যটকদের জন্য হয়ে উঠবে অবিস্মরণীয় স্মৃতি। এসব বাস্তব অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে,যা আগের ‘চায়না ট্রাভেল’ আলোচনার সঙ্গে সাম্প্রতিক ‘বিকামিং চাইনিজ’ ট্রেন্ডের সুর মিলিত হচ্ছে।
এসব উদ্যোগ ক্রমাগতভাবে চীনা সংস্কৃতি ও পর্যটনের আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াচ্ছ। চীনে বিদেশি পর্যটনের যখন দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটছে, তখন এটি এক চমৎকার দ্বিমুখী অগ্রযাত্রায় পরিণত হয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের জন্য দেওয়া সুবিধা ও সেবার মাধ্যমে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে এক বহুমাত্রিক, বাস্তব এবং প্রাচীন ও আধুনিকের সমন্বয়ে এগিয়ে চলা চীনকে।
সূত্র:শিশির-তৌহিদ-আনন্দি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।

