“সরকার যায় সরকার আসে কিন্তু এসব নীতি কখনো পরিবর্তন হয় না”—বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু যুব মহাজোটের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি প্রদীপ কান্তি দে-র এই মন্তব্যটি বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনেও সংখ্যালঘু বিশেষ করে সনাতনী সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের চিত্র প্রায় অপরিবর্তিত।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল: বিচারহীনতার সূচনা
২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পুরো সময়জুড়ে দেশব্যাপী সংখ্যালঘু নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে:
তথাগত তথ্যের অভাব ও উদাসীনতা: এই সময়ে অন্তত ২,৯০০টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হলেও তৎকালীন সরকার অনেক ক্ষেত্রে একে কেবল ‘রাজনৈতিক সহিংসতা’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে।
দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড: ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাস নামে এক যুবককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, যার সুষ্ঠু বিচার আজও আলোর মুখ দেখেনি।
মন্দির ও ঘরবাড়ি দখল: এই সময়ে অন্তত ২০৫টি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যা নিয়ে বিভিন্ন সময় হিন্দু যুব মহাজোটসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো প্রতিবাদ জানালেও অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসেনি।
২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী চিত্র: বদলায়নি বাস্তবতা
২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠিত হলেও সনাতনীদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং যারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, নির্বাচনের পর তাদের ওপর নতুন করে প্রতিহিংসা নেমে এসেছে।
ভোটারদের ওপর প্রতিহিংসা: ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন স্থানে ভোট পরবর্তী সহিংসতায় সনাতনীদের বসতভিটায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। প্রদীপ কান্তি দে-র মতে, “ভোট দেওয়া যদি অপরাধ হয়, তবে গণতন্ত্রের অর্থ কী?”
ধর্ম অবমাননার পুনরাবৃত্তি: ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শুরুতে দেশের অন্তত তিনটি জেলায় পরিকল্পিতভাবে ‘ধর্ম অবমাননার’ গুজব ছড়িয়ে মন্দির ভাঙচুর ও ঘরবাড়িতে লুটতরাজ করা হয়েছে, যা অনেকটা ২০২৪-২৫ সালের অন্তর্বর্তী আমলের মতোই দেখা যাচ্ছে।
প্রশাসনিক স্থবিরতা: আগের সরকারের মতো বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অপরাধীদের মাঝে এক ধরনের ‘অভয়’ কাজ করছে।
প্রদীপ কান্তি দে-র মন্তব্য ও বর্তমানের দাবি
প্রদীপ কান্তি দে তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, তা সরকার পরিবর্তনের সাথে বদলায়নি।
বর্তমানে সনাতনীদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
১. ২০২৪ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত হওয়া সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন।
২. দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন’ দ্রুত পাশ করা।
৩. রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সংখ্যালঘুদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানো বন্ধ করতে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি।
২০২৬ সালের নতুন সূর্য উঠলেও বাংলাদেশের সনাতনী সম্প্রদায়ের জন্য তা যেন একই পুরনো অন্ধকারের পুনরাবৃত্তি। নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও রাজপথের লড়াই ও নিরাপত্তার জন্য আর্তনাদ থামেনি। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের চরিত্রে মৌলিক পরিবর্তন না এলে প্রদীপ কান্তি দে-র আক্ষেপই চিরন্তন সত্য হয়ে থেকে যাবে।

