মোঃ মাহফুজুল ইসলাম
নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি।
নওগাঁ জেলার একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল মডেল স্কুলের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, প্রতারণা, ভুয়া কাবিননামা তৈরি, হুমকি ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক ফরহাদ হোসেন বর্তমানে একাধিক মামলার আসামি বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, ফরহাদ হোসেন তার বৈধ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও স্কুলে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করতেন। বিশেষ করে যেসব অভিভাবিকার স্বামী প্রবাসে বা বাড়ির বাইরে থাকেন তাদের টার্গেট করে সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালে এক অভিভাবিকার সঙ্গে ফরহাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই নারীর স্বামী প্রবাসে থাকায় তিনি নিয়মিত সন্তানকে নিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতেন এবং তার ছেলেকে বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়াতেন ফরহাদ। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হলে তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান। বিষয়টি জানাজানি হলে স্কুলের পরিচালক শহীদ প্রাং গোপনে সমঝোতার মাধ্যমে ওই নারীকে তার স্বামীর সংসারে ফেরত পাঠান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ফরহাদ হোসেন ওই স্কুলের এক অফিস সহায়িকার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রেমের ফাঁদে ফেলে ভুয়া কাজী ও ভুয়া কাবিননামার মাধ্যমে তাকে বিয়ে করেন। দেনমোহর বাবদ ছয় লাখ টাকা দেখিয়ে একটি ভুয়া জমির কাগজ উপস্থাপন করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পেরে ভুক্তভোগী নারী দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করেন। শুনানি শেষে প্রতারণা মামলায় জড়িত ভুয়া কাজীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে ভুক্তভোগী নারী নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলা করলে আদালত সার্বিক দিক বিবেচনায় কাবিন সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। আদালতের আদেশ অনুযায়ী ফরহাদ ওই নারীকে কাবিন করতে বাধ্য হন। এরপর দেনমোহর আদায়ের দাবিতে পারিবারিক আদালতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, মামলাগুলো চলমান অবস্থায় একদিন আদালত চত্বরে ফরহাদ ভুক্তভোগী নারীকে মারধর করেন এবং মামলা তুলে নিতে হুমকি দেন। এ ঘটনায় আবারও একটি মামলা দায়ের করা হয়।
ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, সম্প্রতি স্কুলের প্রিন্সিপাল আপস-মীমাংসার আশ্বাস দিয়ে তাদের সংসার হবে বলে জানান। এরপর অভিযুক্ত শিক্ষক কয়েকবার তার বাড়িতে যাতায়াত করেন এবং তাকে জানান, সন্তান নিলে পরিবারের সবাই বিষয়টি মেনে নেবে। সেই বিশ্বাসে তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হয় এবং ওই নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কিন্তু পরে ফরহাদ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন তিনি ওই নারীর সঙ্গে সংসার করবেন না। ফলে সামাজিক ও পারিবারিক চাপে ওই নারী গর্ভপাত করতে বাধ্য হন। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়ে তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন বলে দাবি করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত শিক্ষক স্কুলে কর্মরত থাকার সুযোগ নিয়ে একাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবিকার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অভিভাবকদের মানসিক স্বস্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযুক্ত শিক্ষক ফরহাদ হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এক নারীর সঙ্গে পরিচয় থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেন। আরেক নারীর বিষয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকায় তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “আপনাদের যা করার আছে তা করেন।”
ঘটনার বিষয়ে ন্যাশনাল মডেল স্কুলের পরিচালক শহীদ প্রাং মুঠোফোনে বলেন, “ধারাবাহিকভাবে যে ঘটনাগুলো বলা হচ্ছে তার বেশিরভাগই আমি জানি। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার বসা হয়েছে সমাধানের জন্য, কিন্তু সমাধান হয়নি। আমার দৃষ্টিতে ফরহাদ একজন নিকৃষ্ট ছেলে।” তবে বিস্তারিত বক্তব্য দিতে তিনি সামনাসামনি কথা বলার কথা জানান।
এদিকে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দেন এবং সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন। তবে তিনি আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেননি।
স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, “শিক্ষকতা অত্যন্ত সম্মানজনক ও দায়িত্বশীল পেশা। একজন শিক্ষক শুধু পাঠদানই করেন না, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রতারণা বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করুক এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

