বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রান্তরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছ যেন শুধু প্রকৃতির শোভাই নয়, সম্ভাবনারও প্রতীক। সেই সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের স্বপ্ন নিয়ে প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে গবেষণা করেছেন একজন বিজ্ঞানী। নারিকেল গাছের কচি মোচার রস স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হয় নীরা সেই রস থেকেই তৈরি করা যায় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর গুড়। এই প্রাকৃতিক মিষ্টিজাত পণ্য দেশের খাদ্যসংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি গবেষকরা ।
নারিকেল গাছের কচি ফুলের মোচা থেকে বিশেষ কৌশলে সংগ্রহ করা হয় এই রস। মোচার অগ্রভাগ সাবধানে কেটে সেখানে একটি পরিষ্কার পাত্র ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণত দিনে দুইবার সকালে ও বিকেলে রস সংগ্রহ করা হয়। রস যাতে দ্রুত নষ্ট বা ফারমেন্ট না হয়ে যায়, সেজন্য পাত্রে সামান্য চুন বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। সংগৃহীত স্বচ্ছ ও মিষ্টি এই তরলই নীরা নামে পরিচিত।
সংগৃহীত নীরা প্রথমে পরিষ্কার কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া হয়। এরপর বড় কড়াইয়ে ঢেলে ধীরে ধীরে জ্বাল দেওয়া হয়। জ্বাল দেওয়ার সময় উপরে জমে ওঠা ফেনা ও অমেধ্য তুলে ফেলা হয়। দীর্ঘক্ষণ জ্বাল দেওয়ার ফলে রস ঘন হয়ে আঠালো আকার ধারণ করে। নির্দিষ্ট ঘনত্বে পৌঁছালে তা চুলা থেকে নামিয়ে ছাঁচে ঢেলে ঠান্ডা করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা শক্ত হয়ে পরিণত হয় সুগন্ধি ও সুস্বাদু গুড়ে।
নারিকেল গুড় শুধু স্বাদের দিক থেকেই নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে প্রাকৃতিক শর্করা, খনিজ উপাদান ও শক্তি। পিঠা, পায়েস, চা এবং নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারে এটি ব্যবহার করা যায়। পরিশোধিত চিনির বিকল্প হিসেবে স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছেও এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।
এক বিজ্ঞানীর দীর্ঘ সাধনা:
এই প্রযুক্তি নিয়ে ২০১৫ সালে গবেষণা শুরু করেন বিসিআরআই (BSRI), ঈশ্বরদী পাবনার সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আবুল হাসনাত। প্রায় ১১ বছর ধরে তিনি নারিকেল গাছের রস সংগ্রহ ও তা থেকে গুড় তৈরির উপযোগী পদ্ধতি উদ্ভাবনে নিরলস পরিশ্রম করেন। মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কৃষকদের সম্ভাবনা দেখানোর জন্য তিনি দীর্ঘ সময় ব্যয় করেছেন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলাযায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে এই গবেষণা বড় পরিসরে বাস্তবায়নের সুযোগ পায়নি। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, গবেষণাটি পূর্ণতা পাওয়ার আগেই তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তার দীর্ঘদিনের শ্রম ও গবেষণার ফল যথাযথভাবে আলোর মুখ দেখার সুযোগ পায়নি।
এদিকে এখন এই প্রযুক্তির ফলাফলকে অন্য কেউ নিজেদের উদ্যোগ বা গবেষণা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন এমন অভিযোগও উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যে গবেষক বছরের পর বছর মাঠে ঘাম ঝরিয়ে এই প্রযুক্তির ভিত্তি তৈরি করেছেন, তাকে যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন দেওয়া জরুরি।
অনেকের মতে, বিজ্ঞানী মো. আবুল হাসনাতকে সংশ্লিষ্ট গবেষণা কার্যক্রমে পুনরায় যুক্ত করা হলে এবং তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো গেলে এই প্রযুক্তি দ্রুত কৃষক পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারিকেল রস থেকে গুড় উৎপাদন একটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উদ্যোগ। এটি গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষকের অতিরিক্ত আয় বৃদ্ধি এবং দেশীয় খাদ্যসংস্কৃতি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে অসংখ্য নারিকেল গাছ রয়েছে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণার ধারাবাহিকতা এবং যোগ্য গবেষকদের মূল্যায়নের মাধ্যমে এই উদ্যোগকে একটি সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত করা সম্ভব। আর সেই পথচলায় বিজ্ঞানী আবুল হাসনাতের মতো নিবেদিত গবেষকদের অবদান স্মরণ ও স্বীকৃতি দেওয়াই হবে সময়ের দাবি।

