শহীদুল ইসলাম শরীফ, স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকার দোহার উপজেলায় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে তৃণমূল রাজনীতির দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। গতানুগতিক আদর্শিক রাজনীতির জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘ক্ষমতার সান্নিধ্য’ পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে ভেসে আসা ‘হাইব্রিড’ নেতাদের দাপটে এখন কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন দলের দুর্দিনের কান্ডারি ও ত্যাগী কর্মীরা। স্থানীয় রাজনীতিতে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক বিচিত্র কৌশল— যাকে এলাকাবাসী অভিহিত করছেন ‘পারিবারিক রাজনৈতিক বীমা’ হিসেবে।
উপজেলায় বর্তমানে এমন অনেক প্রভাবশালী পরিবারের দেখা মিলছে, যাদের সদস্যরা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মেরুতে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। এক ভাই এক দলের নেতৃত্বে থাকলে অন্য ভাই বা নিকটাত্মীয় থাকছেন বিরোধী শিবিরে। সাধারণ মানুষের মতে, এটি কোনো আদর্শিক মতভেদ নয়, বরং ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার একটি ‘সেফ জোন’ তৈরির কৌশল। দল যেটাই ক্ষমতায় আসুক, পরিবারের অন্তত একজন যেন ছড়ি ঘোরাতে পারেন এবং বিপদে ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারেন, এটাই এই ‘রাজনৈতিক বীমা’র মূল ভিত্তি।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর একদল নেতা রাতারাতি ভোল পালটে নতুন দলের ‘সুপার কর্মী’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। এই সুবিধাবাদীরা অর্থের প্রভাব ও উপরমহলের তদবির কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করে নিচ্ছেন। ফলে যারা বছরের পর বছর জেল-জুলুম সহ্য করে দলকে আঁকড়ে ধরেছিলেন, তারা আজ নিজ দলেই অবহেলিত। আদর্শিক কর্মীদের এই ক্ষোভ যে কোনো সময় বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নব্য এই নেতারা রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। হাট-বাজার ইজারা, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং স্থানীয় বিচার-সালিশের নিয়ন্ত্রণে সুযোগসন্ধানীর আশায় বুক বেধে রয়েছে। এমনকি নিজেদের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক স্বার্থ হাসিলের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রভাবিত করার চেষ্টায় ততপর। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রকৃত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত এবং সুস্থ রাজনীতির ধারা ব্যাহত হবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের শীর্ষ ও স্থানীয় নেতৃত্বের কঠোর অবস্থান। দোহার-নবাবগঞ্জের মাটি ও মানুষের নেতা, বর্তমান ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের ঢাকা জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি আবুল হাসেম বেপারী বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্যে তৃণমূলের এই উদ্বেগের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। উভয় নেতা দলের ত্যাগী ও নির্যাতিত কর্মীদের অধিকার রক্ষায় বদ্ধপরিকর। তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে যে, নব্য আসা ‘বসন্তের কোকিল’ বা সুবিধাবাদীদের ভিড়ে যারা বিগত ১৭ বছর জেল-জুলুম ও রাজপথের লড়াইয়ে রক্ত দিয়েছেন, সেই ত্যাগী কর্মীরা কোনোভাবেই উপেক্ষিত হবেন না। তারা তৃণমূলকে আশ্বস্ত করেছেন যে, হাইব্রিড নেতাদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা নয়, বরং দলের প্রতি আনুগত্য এবং ত্যাগই হবে আগামী দিনে নেতৃত্বের মূল মাপকাঠি।
রাজনীতির এই অশুভ রূপান্তর নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ জনসাধারণ ও সচেতন মহল। তাদের মতে, সুবিধাবাদীদের উত্থানে রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। প্রকৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে ‘পারিবারিক ব্যবসার’ রূপ নিচ্ছে। দলীয় পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিগত দিনের আনুগত্য কঠোরভাবে যাচাই করা এখন সময়ের দাবি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ‘ডিগবাজি’ আর ‘হাইব্রিড’ নেতাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত তৃণমূল পর্যায়ে পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীর পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং দলের প্রতি বিগত দিনের আনুগত্য কঠোরভাবে যাচাই করা।

