কলাম (MD Jahidul Islam)
আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। ভোরের প্রথম সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে যেন নতুন করে জেগে উঠেছে পুরো বাংলা। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় মানুষের মনও—পুরোনো দিনের ক্লান্তি, হতাশা আর না-পাওয়ার হিসাবগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, জায়গা করে নেয় নতুন স্বপ্ন, নতুন আশা।
সকালটা আজ অন্য সব দিনের মতো নয়। আজকের সকালেই যেন আলাদা এক সুর, এক মায়া। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় যেমন মানুষের ঢল, তেমনি গ্রামবাংলার নিস্তব্ধ পথেও উৎসবের ছোঁয়া। ছোট ছোট শিশুরা নতুন জামা পরে ঘর থেকে বের হচ্ছে, বড়রা প্রস্তুতি নিচ্ছেন দিনটি আনন্দে কাটানোর। কারও হাতে ফুল, কারও মুখে হাসি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ।
পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির শিকড়ে ফিরে যাওয়া। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমরা এক সংস্কৃতির মানুষ, আমাদের ইতিহাস এক, আমাদের অনুভূতিও এক। ধর্ম, বর্ণ বা পরিচয়ের ভেদাভেদ এখানে গুরুত্ব হারায়; গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, একসঙ্গে থাকার আনন্দ।
এই দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলা। মুঘল আমলে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়েছিল প্রশাসনিক প্রয়োজনে, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নেয় মানুষের উৎসবে। কৃষকের ঘরে নতুন ফসলের আনন্দ, ব্যবসায়ীর হালখাতা, আর সাধারণ মানুষের মিলন—সবকিছু মিলে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে জীবনের উৎসব।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আজ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপন করা হচ্ছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, গান, নাচ, কবিতা, বৈশাখী মেলা—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল উৎসব। রমনার বটমূল থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার মাঠ—সব জায়গায় আজ একই রঙ, একই আনন্দ।
এই উৎসবের এক বিশেষ আকর্ষণ হলো সকালের খাবার—পান্তা-ইলিশ। পান্তা ভাত, ইলিশ ভাজা, কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজের এই সাধারণ আয়োজনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। এটি কেবল একটি খাবার নয়; এটি মাটির সঙ্গে, শিকড়ের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগ। অনেকের কাছে এই সকালের টেবিল মানেই শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময়, একসঙ্গে বসে খাওয়ার আনন্দ।
তবে এই আনন্দের মধ্যেও কিছু দায়িত্ব রয়েছে আমাদের। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পহেলা বৈশাখকে ঘিরে কিছু অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা দেখা যায়। কেউ কেউ এটিকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করতে চান, যা আমাদের ঐতিহ্যের মূল চেতনাকে আঘাত করে।
পহেলা বৈশাখ কোনো একক ধর্মের নয়—এটি বাঙালির সংস্কৃতি, সবার সংস্কৃতি। এই দিনটি আমাদের শেখায় সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের প্রতি ভালোবাসা। তাই এই উৎসবকে ঘিরে কোনো ধরনের বিভেদ সৃষ্টি না করে বরং ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
আজকের দিনে আমাদের করণীয়ও কম নয়। উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তা বজায় রাখা, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা মেনে চলা জরুরি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকা এবং অন্যদেরও সচেতন করা প্রয়োজন।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, এটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। জীবনের ভুলগুলো শুধরে নেওয়ার, নতুন করে শুরু করার সাহস জোগায়। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, নতুন সূর্য ঠিকই ওঠে।
নতুন বছরের এই প্রথম দিনে তাই প্রত্যাশা—মানুষে মানুষে দূরত্ব কমুক, ভালোবাসা বাড়ুক, ভেদাভেদ মুছে যাক। আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ আরও সুন্দর হয়ে উঠুক সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার আলোয়।
আজকের এই সূর্যোদয় শুধু একটি নতুন দিনের সূচনা নয়, এটি নতুন একটি পথের শুরু।
সেই পথে থাকুক আশা, থাকুক ভালোবাসা, থাকুক একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
শুভ নববর্ষ। 🌸

