ডা.মু.মাহতাব হোসাইন মাজেদ
দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থা, অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতার পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপির বিপুল বিজয় দেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার সূচনা করেছে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়; এটি ছিল সমাজের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ, আশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত বহিঃপ্রকাশ। ভোটের ফলাফল স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—মানুষ আর প্রতিশ্রুতির বৃত্তে আবদ্ধ থাকতে চায় না, তারা দৃশ্যমান, টেকসই ও ন্যায্য শাসন প্রত্যাশা করে।
নির্বাচনকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি এবং ভোট-পরবর্তী জনপ্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষ এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। বহুদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহ ও প্রত্যাশার একটি নতুন স্রোত দেখা গেছে। এই রায় ছিল একটি সুস্পষ্ট বার্তা—রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার ঘাটতি আর মেনে নেওয়া হবে না। ফলে এই বিপুল বিজয় নতুন সরকারের জন্য যেমন রাজনৈতিক সাফল্য, তেমনি এটি এক বিশাল নৈতিক ও প্রশাসনিক দায়ভারও বটে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যে শক্তিশালী গণম্যান্ডেট অর্জন করেছে, তা হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। জনগণ তাদের হাতে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার তুলে দিয়েছে পরিবর্তনের প্রত্যাশায়। তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই প্রত্যাশা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, আর নতুন সরকার কতটা দক্ষতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করতে পারবে।
মানুষের প্রত্যাশার তালিকায় সবার আগে আসে সুশাসন। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষের জীবনে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, ঘুষ ও দালালনির্ভরতা এখনো বড় বাস্তবতা। নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা—
রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহি থাকবে এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে অন্য সব সংস্কারের পথ অনেকটাই সুগম হবে—এ কথা মানুষ বিশ্বাস করতে চায়।
এরপরই আসে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন, যা সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয়—সব মিলিয়ে মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা—বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি, সিন্ডিকেট ও মজুতদারির বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত নীতি। কাগুজে সূচকের উন্নতি নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তিই হবে অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।
কর্মসংস্থান ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর সবচেয়ে আলোচিত ও সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। শিক্ষিত তরুণ সমাজ দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের বোঝা বহন করছে। তারা শুধু চাকরি চায় না; চায় সম্মানজনক কাজ, ন্যায্য সুযোগ এবং মেধার যথাযথ মূল্যায়ন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে হতাশা আরও বাড়বে। শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবাখাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে—এটাই মানুষের প্রত্যাশা।
একই সঙ্গে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও মানুষের বড় চাওয়া। বৈদেশিক কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এই খাতে অনিয়ম, প্রতারণা ও কূটনৈতিক দুর্বলতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নতুন সরকার চাইলে কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রবাসীদের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এতে রাষ্ট্রের অর্থনীতি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি প্রবাসী পরিবারগুলোর জীবনেও স্বস্তি ফিরবে।
শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা কম নয়। শিক্ষা যেন কেবল পরীক্ষানির্ভর ও সার্টিফিকেটকেন্দ্রিক না হয়ে দক্ষতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়—এটাই সাধারণ মানুষের চাওয়া।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মানোন্নয়ন, শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষা খাত শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না—এই উপলব্ধি সমাজে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবনের আরেকটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সরকারি হাসপাতালগুলোর সেবার মান, ওষুধের প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
মানুষ চায়—চিকিৎসা যেন পণ্যে পরিণত না হয়, অসুস্থ হলে যেন সর্বস্ব বিক্রি করতে না হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসার মান উন্নত করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই এখন সময়ের দাবি।
ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার নিয়েও মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। অপরাধ দমনে কেবল দৃশ্যমান অভিযান নয়, প্রয়োজন কার্যকর বিচার ব্যবস্থা।
মামলার দীর্ঘসূত্রতা, প্রভাবশালীদের দায়মুক্তি এবং বিচার বিলম্ব মানুষের আস্থা নষ্ট করেছে। নতুন সরকার যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নিরপেক্ষ ও সাহসী ভূমিকা নেয়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রশাসনের মানবিকতা ও দক্ষতা।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আচরণে অহংকার ও উদাসীনতা থাকলে সরকার পরিবর্তন হলেও মানুষের ভোগান্তি কমে না।
ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গতিশীলতা এবং নাগরিকবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে পারলে সরকারের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে।
রাজনৈতিক সহনশীলতা ও জাতীয় ঐক্য ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জনগণ বিভাজনের রাজনীতি নয়, স্থিতিশীলতা ও ঐক্য চায়। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী কণ্ঠকে দমনের সংস্কৃতি থেকে সরে আসাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচয়। প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে এই বিজয় আরও অর্থবহ

