ডা.মু.মাহতাব হোসাইন মাজেদ
নতুন সরকার গঠনের প্রথম দিনটি রাজনীতিতে কেবল আনুষ্ঠানিক সূচনা নয়; এটি একটি মানসিক পরীক্ষার দিন। রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর হয়তো একদিনে সম্পন্ন হয়, কিন্তু মানুষের আস্থা অর্জন একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা একসঙ্গে জমাট বেঁধেছে, সেখানে নতুন সরকারের প্রথম দিনের সিদ্ধান্তগুলোকে মানুষ প্রতীকের চেয়েও বেশি বাস্তবতার আলোকে বিচার করে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই নতুন মন্ত্রিসভা যে তিনটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে এনেছে—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা—তা রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়। এগুলো দীর্ঘদিন অবহেলিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যেগুলো নাগরিকের দৈনন্দিন জীবন সরাসরি প্রভাবিত করেছে।
আস্থাহীন সময়েই নতুন যাত্রা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর নেতৃত্বে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে জনগণ আর প্রতিশ্রুতিতে সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন কিংবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানানো রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার বার্তা দিলেও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে এসবের মূল্য তখনই আছে, যখন তা শাসনের আচরণে প্রতিফলিত হয়।
মানুষের প্রশ্ন আজ স্পষ্ট—এই সরকার কি অতীতের মতো ক্ষমতার ভাষায় কথা বলবে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বকে মানুষের জীবনমানের সঙ্গে যুক্ত করবে?
আইন-শৃঙ্খলা: রাষ্ট্র কি আবার নিয়ন্ত্রণে ফিরবে?
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি একটি রাষ্ট্রের শক্তির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রকাশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘মব কালচার’ বা সংঘবদ্ধ বিশৃঙ্খলার বিস্তার প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্র তার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অনেকাংশে হারিয়েছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন নিজেরাই বিচারক হয়ে ওঠে, তখন আইনের শাসন কার্যত ভেঙে পড়ে।
নতুন সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে—মবের নামে কোনো সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। বাস্তবতা হলো, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো এককালীন সিদ্ধান্তে আসে না।
এখানে প্রয়োজন পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং, দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার, সাক্ষ্য সুরক্ষা এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের অবসান। অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকেই যদি রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তবেই আইন তার নৈতিক শক্তি ফিরে পাবে।
দ্রব্যমূল্য: মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত রাজনীতি
রাজনীতির ভাষায় বহু জটিল ইস্যু থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় রাজনীতি হলো বাজার। চাল, ডাল, তেল কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যখন আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ জমে ওঠে নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে।
নতুন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ থাকা একেবারেই সময়োপযোগী। বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙার কথা বলেছেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, সিন্ডিকেট ভাঙা রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার প্রশ্ন।
নিয়মিত বাজার তদারকি, মজুতদারি প্রতিরোধ, আমদানি নীতির কার্যকর প্রয়োগ এবং ভোক্তা অধিকার সংস্থার দৃশ্যমান উপস্থিতি ছাড়া বাজার কখনোই স্থিতিশীল থাকে না। মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিদিনের বাজারে স্বস্তি দেখতে চায়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি: নীরব সংকটের সামাজিক অভিঘাত
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট রাজনীতির মূল আলোচনার বাইরে থাকলেও প্রভাব সবচেয়ে বিস্তৃত ও দীর্ঘস্থায়ী। শিল্প উৎপাদন, কৃষি সেচ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা—সবখানেই বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।
বোরো মৌসুম সামনে রেখে এই খাতে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিদ্যুৎ সংকট মানে সেচ ব্যাহত হওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে দামের চাপ। তাই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
তবে দীর্ঘদিনের অপচয়, ভুল পরিকল্পনা ও অনিয়ম দূর না করলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে—এটাই কঠিন বাস্তবতা।
অর্থনীতি: পৃষ্ঠপোষকতার বেড়াজাল ভাঙার চ্যালেঞ্জ
নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার কথা বলেছেন। রাজনৈতিকভাবে সাহসী হলেও বাস্তবায়নে সবচেয়ে কঠিন।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করেছে। আইনগত সংস্কার, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া অর্থনীতিতে আস্থা ফিরবে না।
এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নীতি ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবায়নকে সমন্বিত করা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: মানবিক রাষ্ট্রের মাপকাঠি
শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক–এর ভর্তি ফি না নেওয়ার ঘোষণা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। এটি শিক্ষায় ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস করতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পাঠ্যক্রমের মান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া টেকসই পরিবর্তন আসবে না।
স্বাস্থ্য খাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল শৃঙ্খলা ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থার কথা বলেছেন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা কার্যকর করতে হলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানবিক ব্যবস্থাপনা, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং প্রণোদনার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।
আর প্রথম দিনে ঘোষিত পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, তবে জনগণ শুধু ঘোষণায় সন্তুষ্ট হবে না; তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়—বাজার স্থিতিশীল হয়েছে কি না, বিদ্যুৎ সরবরাহ বাধাহীন হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীরা কি সহজভাবে ভর্তি হতে পারছে এবং স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হচ্ছে কি না—এসবের ওপরই সরকারি কার্যক্ষমতা বিচার হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নাকি নতুন দৃষ্টান্ত?নতুন সরকারের প্রথম দিনের অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে—সরকারগুলো সাধারণত মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানে ব্যর্থ হওয়ায় জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাব—এই বিষয়গুলোই একের পর এক সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে বলছে, প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর প্রয়োগই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকৃত মানদণ্ড।
এ মুহূর্তে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে একটি বিরল সুযোগ। যদি তারা অগ্রাধিকারগুলো বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনে, তবে এটি হবে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটবে।
রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কর্মফল, প্রতিশ্রুতি নয়। নতুন সরকার কি এই কঠিন পরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করবে, নাকি কেবল সূচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা সময়ই প্রমাণ করবে।

