মোঃ সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব্যুরো:
দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে চট্টগ্রামে আয়োজিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুস। আগামী শনিবার (৬ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিতব্য এ জুলুসকে ঘিরে ইতোমধ্যে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবের আমেজ। নগরের বিভিন্ন জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছে ইসলামী তোরন।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে এই জুলুস শুধু চট্টগ্রাম মহানগরীতে সিমাবদ্ধ নয় বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায়ও জসনে জুলুস পালন করা হয়। বিভিন্ন মাদ্রাসা এবং ইসলাম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মহান ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। সুন্নি অধ্যুষিত এলাকা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সহ স্ব-স্ব উদ্যোগে মাহফিলের আয়োজন করে।
আনজুমান-এ-রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় অনুষ্ঠিতব্য এই জুলুস বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় শোভাযাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চট্টগ্রামে আয়োজিত এ জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ (মা.জি.আ)। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন শাহজাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ্ (মা.জি.আ) ও সৈয়্যদ মুহাম্মদ মেহমুদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ)। অতীতে এই মহান জুলুসের নেতৃত্ব দিতেন আল্লামা সৈয়দ মোহাম্মদ তাহের শাহ।
ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রামের এই মহান জুলুসে চট্টগ্রাম বিভাগ এর প্রতিটি জেলা এবং উপজেলা থেকে আঞ্জুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট তত্ত্বাবধানে গাউছিয়া হক কমিটির ভক্তবৃন্দরা ট্রাক বাস জিপ এসব পরিবহন করে চট্টগ্রাম মহানগরীর জামিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদ্রাসায় জমায়েত হয়। লক্ষ লক্ষ সুন্নি অনুসারী জুলুসে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে সকাল থেকেই মহানগরীতে অবস্থান করে। সারিবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন যানবাহন নিয়েও চট্টগ্রাম মহানগর এর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে জুলুসের এ শোভাযাত্রা।
এবারের জুলুসের রুট সামান্য সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। মুরাদপুরের জামেয়া মাদরাসা সংলগ্ন ষোলশহর আলমগীর খানকা-এ কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া থেকে যাত্রা শুরু হবে। এরপর মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট হয়ে জিইসির পেনিনসুলার সামনে দিয়ে শোভাযাত্রা জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদরাসা মাঠে গিয়ে শেষ হবে। সেখানে দেশবরেণ্য আলেমরা বক্তব্য রাখবেন এবং দেশ ও জাতির শান্তি-সমৃদ্ধি কামনায় বিশেষ মোনাজাত হবে।
আনজুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের মুখপাত্র অ্যাডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতেয়ার জানান, দীর্ঘ এক মাসের ও সময় ধরে এ জুলুসের প্রস্তুতি চলছে। দীর্ঘ ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করে প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা ও বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকেও আশেকে রাসূলরা এ শোভাযাত্রায় অংশ নিতে আসেন প্রতিবছর। প্রতিবছর ১২ই রবিউল সরকারি বন্ধ থাকায় মানুষের শোভাযাত্রা করা হয় নির্বিঘ্নে।
চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জুলুসকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন মোড়ে তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। রাস্তার মাঝখানে পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসা, বিভিন্ন খানকা ও নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ইতোমধ্যে আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। বিশেষ করে মদুনাঘাট সেতু হোক কর্ণফুলী নদীর উপর কালুরঘাট সেতুতে আনজুমানের পতাকা ব্যাপক দৃষ্টি পড়ছে সকলের।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে চট্টগ্রামের প্রায় এলাকায় মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় পুরো রবিউল আওয়াল মাস জুড়ে। এতে আগত অতিথিদের জন্য তবারক বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়। তাছাড়া জুলুসের দিন শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া অতিথিদের জন্য নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে মুসলিম ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিরা স্ব স্ব উদ্যোগে শরবত ও বিভিন্ন প্রকারের নাস্তা বিতরণ করার ব্যবস্থা করে।
অনুসন্ধানে জানা যায় ১৯৭৪ সালের ১২ রবিউল আউয়াল প্রথমবার চট্টগ্রামে জশনে জুলুসের সূচনা হয়। পাকিস্তানের সিরিকোট শরিফ দরবারে আলিয়া কাদেরিয়ার তৎকালীন সাজ্জাদানশীন ও আধ্যাত্মিক সাধক আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রা.) এ জুলুসের প্রবর্তন করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও বিশ্বশান্তির বার্তা প্রচার।
প্রতিবারের মতো এবারের জুলুসকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্সের (এএসএফ) প্রশিক্ষিত সদস্য, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ ও জামেয়ার বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। সর্বোপরি মহান পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত এর শোভাযাত্রা ও মাহফিলকে সফল করার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে আঞ্জুমানে রহমানিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট এর পক্ষ থেকে।

