আব্দুল আজিজ, নাচোল (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি:
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার চন্দনা গ্রামে ভোরের আলো ফোটার আগেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষক মোঃ শফিকুল ইসলাম। অন্য মৌসুমে ধান বা সবজি চাষ করলেও এবার তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন পথ—অসময়ে তরমুজ চাষ। উপজেলা কৃষি অফিসের সহযোগিতা ও আধুনিক মালচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ২.৫ বিঘা জমিতে তিনি গড়ে তুলেছেন সবুজের সমারোহ। মাঠে গাঢ় সবুজ পাতার নিচে উঁকি দিচ্ছে গোলগাল তরমুজ, যা দেখে শফিকুল ইসলামের চোখেমুখে ফুটে উঠছে নতুন স্বপ্ন।
নাচোল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সলেহ্ আকরাম বলেন, “অসময়ে তরমুজ চাষ আমাদের জন্য একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। সাধারণত তরমুজ গ্রীষ্মকালের ফসল হলেও আধুনিক মালচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি এখন শীতকালেও উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। এতে শুধু ফলনের মানই বাড়ছে না, বরং রোগবালাইও অনেকটা কমে যাচ্ছে। আরডিএডিপি প্রকল্পের আওতায় আমরা কৃষকদের এ প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করছি। শফিকুল ইসলামের ক্ষেতটি এ অঞ্চলের জন্য একটি মডেল হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রতি বিঘায় অন্তত এক লাখ টাকা আয় করার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষক যদি সময়মতো বাজারজাত করতে পারেন, তাহলে এর মাধ্যমে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। একইসঙ্গে স্থানীয় কৃষক সমাজও এ উদ্যোগে আগ্রহী হবে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”
কৃষক মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, “প্রথমে ভেবেছিলাম এত খরচ করে লাভ করা কঠিন হবে। কিন্তু কৃষি অফিসারদের পরামর্শে সাহস পাই। তারা নিয়মিত মাঠে এসে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এখন জমিতে ফল আসতে শুরু করেছে। আগামীকাল থেকেই স্থানীয় বাজারে তরমুজ বিক্রি শুরু করব। প্রতি কেজি ৫০ টাকা দরে বিক্রির আশা করছি। যদি দাম ধরে রাখা যায়, তাহলে আমি শুধু খরচই তুলতে পারব না, বরং বাড়তি আয়ও হবে।”
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমাদের মতো গ্রামের কৃষকদের জন্য এটা বড় আশা। আগে ভাবতাম শুধু মৌসুমেই তরমুজ হয়। এখন বুঝতে পারছি প্রযুক্তি ব্যবহার করলে অসময়েও সম্ভব।”
চন্দনা গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক জানান, মাঠে শফিকুল ইসলামের সাফল্য দেখে তারাও উৎসাহিত হয়েছেন। কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, “আমরা এতদিন ধান-গম বা মৌসুমি সবজিতেই সীমাবদ্ধ ছিলাম। কিন্তু এই নতুন চাষ দেখে আমাদেরও ইচ্ছা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ যদি পাশে থাকে, আমরাও অসময়ে তরমুজ চাষে নামতে চাই।”
অন্য কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “গ্রামে যদি অফসিজন ফসল ফলানো যায়, তাহলে শহর থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসবে। এতে আমরা ভালো দাম পাব, আমাদেরও লাভ হবে।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, অসময়ে তরমুজ চাষ কেবল কৃষকের আয়ের নতুন ক্ষেত্র খুলবে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। মাঠে কাজ করছেন স্থানীয় নারী-পুরুষ শ্রমিকরাও। তারা জানাচ্ছেন, এ ফসলের কারণে মৌসুমহীন সময়ে তাদের কাজের সুযোগ হয়েছে।
নাচোলের চন্দনা গ্রামে অসময়ে তরমুজ চাষের এ সাফল্য কৃষিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সঠিক পরিচর্যা, সরকারি সহায়তা ও বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিকভাবে হলে এ উদ্যোগ শিগগিরই বৃহত্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জকে দেশের তরমুজ উৎপাদনে শীর্ষ স্থানে পৌঁছে দিতে পারে। কৃষক শফিকুল ইসলামের হাসি আজ যেন পুরো এলাকার কৃষকদের মুখেও নতুন স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

