জাকিয়া সুলতানা, ধর্মপাশা (সুনামগঞ্জ)।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ‘সুখাইড় জমিদার বাড়িটি ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে জানান দিচ্ছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটি। তাই এটি সংরক্ষণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে এলাকবাসী এবং সুধীজন।
কথিত আছে, গজারিয়া নদীর উত্তরপার থেকে ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল সুখাইড় জমিদারবাড়ির সীমানা। জমিদারি প্রথা অনেক আগে বিলুপ্ত হলেও সেখানকার বাংলো ঘর, কাছারি ঘর, জলসা ঘর, গুদাম ঘর ও খাসকামরাসহ আঙিনার বিস্তৃত সীমানা এখনও বাড়িটিকে বেশ আকর্ষণীয় করে রেখেছে। জানা যায়, ১৬৯১ সালে মোগল শাসনামলে মহামাণিক্য দত্ত রায় চৌধুরী হুগলি থেকে আসাম যাওয়ার পথে কালিদহ সাগরের স্থলভূমির প্রাকৃতিক রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে ধর্মপাশা উপজেলার সুখাইড়ে জায়গা ক্রয় করেন। ১৬৯৫ সালে জমিদার মোহনলাল ২৫ একর জমির ওপর এ বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেন। দৃষ্টিনন্দন নির্মাণ শৈলীর কারণে বাড়িটি একসময় সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার ‘রাজ মহল’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল। সুখাইড় জমিদার বাড়ির পশ্চিমে ধর্মপাশা, পূর্বে জামালগঞ্জ, উত্তরে বংশীকুন্ডা ও দক্ষিণে মোহনগঞ্জ উপজেলার খাগলাজুর নদীর উত্তর পার। একসময় জমিদারদের মালিকানায় ছিল ধানকুনিয়া বিল, চারদা। চারদা বিল, কাইমের দাইড়, সোনামোড়ল হাওর, ধারাম হাওর, পাগুয়া, ছাতিধরা, রাকলা, বৌলাই নদী ও নোয়া নদীসহ ২০টি বড় বড় জলমহাল। জমিদারদের আয়ের উৎস ছিল প্রজাদের ওপর ধার্যকৃত খাজনা,
হাওরের মৎস্য খামার ও বনজসম্পদ। এককালে যে জমিদার বাড়ি ঘিরে পরিচালিত হতো প্রজাব্যবস্থা, সেই বাড়ির চার ভাগের মধ্যে এখনও বড়বাড়ি, মধ্যমবাড়ি ও ছোটবাড়ি টিকে আছে। জনশ্রুতি আছে, জমিদার বাড়ির মাটির নিচে প্রত্নতত্ত্বের অনেক উপাদান রয়েছে। যা মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কথিত আছে, সুখাইড় জমিদারবাড়ি পরিদর্শন করতে এসেছিলেন ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার। তিনি হাতিতে চড়ে বের হয়েছিলেন বাড়ির কাছে টাঙ্গুয়া হাওরে মাছ শিকার করতে। সে সময় বনজঙ্গল বেশি থাকার কারণে বেলেন্টিয়ারের হাতিকে ৩টি বাঘ আক্রমণ করে। ভয়ে বেলেন্টিয়ার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তখন সুখাইড়ের
জামিদার মথুর চৌধুরী ৩টি বাঘকে গুলি করে হত্যা করেন। জ্ঞান ফেরার পর বেলেন্টিয়ার জমিদারকে নিজের রাইফেলটি উপহার দেন।
১৯২২-২৩ সালে সুখাইড়ে গড়ে ওঠা প্রবণ নানকার বিদ্রোহ জমিদারি প্রথার ভিত নাড়িয়ে দেয়। এমন অনেক কাহিনি বিজড়িত এই জমিদার বাড়ি ঘিরে। সুখাইড় জমিদার বাড়ির বর্তমান বংশধরদের একজন মোহন চৌধুরী জানান, আমাদের এই ঐতিহাসিক বাড়িটি দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায়ই পর্যটকরা আসেন। কিন্তু অর্থাভাবে আমাদের বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার সম্ভব হচ্ছে না। সরকার যদি আমাদের এই বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কারে এগিয়ে আসে, তবে আমরা সাধুবাদ জানাব। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, সুখাইড় জমিদার বাড়ি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। জমিদার বাড়িটি সংস্কারে জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই বিষয়ে অবগত আছে।

