মোহাম্মদ সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব্যুরো:
অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সহ নানা কারণে সন্দীপ পিছিয়ে পড়তেছে। অনেক বিষয়ের জন্য বিখ্যাত সন্দীপ উপজেলা চট্টগ্রাম সহ সারা দেশের একটি বিখ্যাত দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের মাঝে থাকা এদিকের বাসিন্দাদের অধিকাংশ দেশের বাইরে অবস্থান করে এবং শতকরা ১১ শতাংশ রেমিটেন্স এই সন্দ্বীপের প্রবাসীদের কারণেই দেশে আসে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্ব উপকূলে অবস্থিত চট্টগ্রামের একটি উপজেলা হলো সন্দীপ। ৭৬২ কিলোমিটার বর্গ জুড়ে এটি চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। চট্টগ্রাম শহর থেকে সীতাকুন্ড উপজেলার কুমিরা হয়ে এই উপজেলার যাতায়াত ব্যবস্থা রয়েছে। দেশের অনেক প্রাচীনতম সাগরদ্বীপ হলো এটি। অতীতে প্রায় তিন লাখ লোকের বসবাস থাকলেও বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থা অনুন্নত এবং নানা সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে এখানকার মানুষ ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং প্রবাসে অবস্থান করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বেশি। তবে এখানকার নাগরিক হয়েও এখানে বসবাস না করার আগ্রহ হওয়ার কারণ হলো একমাত্র দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে। শুধুমাত্র জাহাজ এবং লঞ্চে আসা-যাওয়া করতে হয় তাই এখানে মানুষ বসবাস করতে আগ্রহ পোষণ করে না। প্রাকৃতিকভাবে আবহাওয়ার খারাপ পরিস্থিতি দেখা দিলেই সন্দ্বীপের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায় যেহেতু যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম হলো লঞ্চ এবং জাহাজ ব্যবস্থা।
সন্দ্বীপের ইতিহাস থেকে জানা যায় একসময় বাণিজ্যের প্রধান জায়গা ছিল সন্দীপ উপজেলা এখানে গড়ে উঠেছিল বিশ্বের সবচাইতে বড় জাহাজ নির্মাণ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো। এখান থেকে নির্মাণ করা জাহাজ খোলার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রপ্তানি হত।
বঙ্গোপসাগরের মধ্যে সন্দীপ উপজেলার অবস্থান হওয়ায় দেশীয় পর্যটক এবং বিদেশী পর্যটক প্রায় সময় এখানে ভ্রমণ করতে দেখা যায়। তেমন কোন পর্যটন কেন্দ্র করে না উঠলেও সাগরকেন্দ্রিক দ্বীপ হওয়াতে পর্যটকদের কাছে একটা আলাদা ভ্রমণ প্রিয় জায়গায় হিসেবে সন্দীপ পরিচিত। শীতকালীন মৌসুমে পর্যটকদের আসা-যাওয়া তাকে উপজেলায় বেশি। পর্যটকদের জন্য তেমন কোন আবাসিকের ব্যবস্থা না থাকলেও পর্যটকরা সকালবেলা গিয়ে বিকেল বেলা ভ্রমণ করে আবার চট্টগ্রাম শহরে ফিরে আসে। এখানকার আরেকটি প্রধান সমস্যা হল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। পর্যটক এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতে নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ বিশেষ করে সন্ধ্যাকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় থাকে। চুরি চিনতাই এর প্রবণতা প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে এখানে। শুধুমাত্র নিরাপত্তাহীনতা এবং সঠিক যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকার কারণে সন্দীপ অনেকটা পিছিয়ে পড়তেছে। অনেক মহীয়সী এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের জন্মস্থান হল এই উপজেলা সন্দ্বীপ। বিশেষ করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের পুরোধা লালমোহন সেন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ মোজাফফর আহমেদ ও মোস্তাফিজুর রহমান স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম উদ্যোক্তা কবি বেলাল মোহাম্মদ সহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তির জন্ম এই দ্বীপ উপজেলায়।
সন্দীপ উপজেলায় ছিল জমিদারি প্রথা ব্রিটিশ আমল ইংরেজ আমল সহ অনেক আমলে এখানে বাণিজ্য নগরী গড়ে তুলেছিল পুরনো জমিদার ও ব্যবসায়ীরা। ওলন্দাজ পরিবার ব্যবসায়িক স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছিল সন্দীপ উপজেলাকে নদীপথের পরিবহন ব্যবস্থা কে উপযুক্ত মনে করে তৎকালীন পুরনো জমিদার ও ব্যবসায়ীরা এই উপজেলা কে বেছে নিয়েছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে চলেছে সন্দীপ উপজেলার পুরনো ঐতিহ্য। সন্দ্বীপের লবণ শিল্প ছিল বৃহৎ ব্যবসা। সন্দ্বীপের উৎপাদিত লবণ সারাদেশ এবং বিশ্বের বাইরেও রপ্তানি হত। সঠিক উদ্যোগ না থাকার কারণে ব্যবসায়ীকে প্রাচীনতম স্থানটি আজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।
সন্দ্বীপের সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের একমাত্র দাবি সন্দ্বীপের সাথে যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরো উন্নত করার জন্য এবং সন্দীপের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। তাহলে সন্দীপ পুরনো ঐতিহ্যে ফিরে যাবে বলে অনেকের ধারণা। অপার সম্ভাবনাময় এই সন্দীপ উপজেলাকে বাণিজ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যাবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে।

