২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনার সরকার পতনের মধ্য দিয়ে একদলীয় কর্তৃত্ববাদী যুগের ইতি টানে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে সূচিত তরুণদের জাগরণ, জনগণের সরব সম্পৃক্ততা এবং বিরোধী শক্তির সম্মিলিত প্রতিরোধে ঘটে ইতিহাসের মোড় ঘোড়ানো এই পরিবর্তন।
সেই সময় আশাবাদী হয়ে উঠেছিল দেশবাসী—একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো দাঁড়াবে। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে এসে দেখা যাচ্ছে, পরিবর্তনের সেই স্বপ্ন এখনও পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হয়নি। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শক্তিগুলোই আজ বিভক্ত। বিএনপি, যাদের ভূমিকাকে আন্দোলনের সময় ‘নীরব কৌশল’ বলা হচ্ছিল, এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে।
আন্দোলনের সফলতা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যদিও আন্দোলনের সময় কোনো ‘মাস্টারমাইন্ড’ প্রকাশ্যে ছিল না, এখন রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্নটি উঠে আসছে বারবার।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের সময় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিল ক্লিনটনের এক ফোরামে বক্তব্যে আন্দোলনের এক ছাত্রনেতাকে ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর থেকেই আন্দোলনের নেতৃত্ব ও মালিকানা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে থাকে।
এই বিতর্কের মধ্যে সবচেয়ে নীরব ছিল বিএনপি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে আন্দোলনের ‘মূল নায়ক’ বলে দাবি করতে শুরু করেছে। যদিও আন্দোলনের সময় এমন বক্তব্য তাদের পক্ষ থেকে শোনা যায়নি।
আওয়ামী লীগ পতনের ঠিক আগে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করেছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার এসে সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এরপর থেকেই জামায়াত ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এনসিপি ও জামায়াত একসঙ্গে কাজ করতে শুরু করে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু ছাত্রনেতাও এনসিপির নেতৃত্বে চলে যায়, যারা পরবর্তীতে জামায়াতের সঙ্গে সমন্বয়ে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘনিষ্ঠতা দুই দলের জন্যই সুবিধাজনক হলেও জনসম্পৃক্ততা তুলনামূলকভাবে কমে গেছে।
লন্ডনে তারেক রহমান ও ড. ইউনূসের বৈঠকের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন গতিপথ তৈরি হয়। যেখানে বিএনপি রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে আলোচনায় নেতৃত্ব দিতে শুরু করে।
যে বিএনপিকে আগে ‘পরিবর্তনে অনাগ্রহী’ বলা হতো, এখন সেই দলই নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার, অন্তর্বর্তী সরকার ও নতুন সংবিধান সংস্কার বিষয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে। ফলে জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে ক্ষোভ ও প্রতিযোগিতা বাড়ছে।
এক সময় আন্দোলনের সমর্থকদের আবেগ যেখানে এনসিপি’র দিকে ছিল, এখন তা অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। চাঁদা দাবিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে দলটির নেতাকর্মীদের নাম জড়িয়েছে, যা জনসম্পৃক্ততার ওপর প্রভাব ফেলেছে।
৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ঘোষণা দেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই ঘোষণাকে বিএনপি ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। তারা বলছে, এটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথ উন্মুক্ত করবে।
বিপরীতে, জামায়াত ও এনসিপি এ ঘোষণায় ‘বিএনপির পক্ষপাত’ দেখেছে। তারা এই প্রক্রিয়ার বৈধতা, নির্বাচন পদ্ধতি এবং জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদিও আন্দোলনের সময় তারাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, বিএনপির গুরুত্ব ততই বাড়ছে। অন্য দলগুলো বিএনপির সমকক্ষ অবস্থানে আসতে পারছে না। বিশেষ করে এনসিপির জনসমাগমহীন কর্মসূচি এবং জামায়াতের সমাবেশে অংশগ্রহণের দ্বৈতনীতি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
আজকে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপিই সবচেয়ে বড় শক্তি। যদিও একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিদলীয় ব্যবস্থা এখন নেই, কিন্তু বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন জোটই ভবিষ্যতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংস্কারের বাস্তবায়ন এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে যাবে। ফলে সময়ের দৌড়ে বিএনপির কৌশলই ঠিক করে দেবে, তারা শুধু ক্ষমতার দাবিদার না হয়ে নতুন বাংলাদেশ গঠনের নেতৃত্ব দিতে পারে কিনা।৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পর বিএনপি রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিএনপি-ই এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি, যাদের হাতেই আগামীর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। রাজনৈতিক মাঠে বল এখন তাদের কোর্টে।

