রবিবার, ২৫ জানুয়ারি। আর মাত্র অল্প কিছুদিন পর—আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি—অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬। এই সময়টা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল এবং নির্ধারক। দলগুলো শেষ মুহূর্তে ভোটের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত, মাঠের রাজনীতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, আর ভোটাররাও তাদের সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একদিনে চার জেলায় রাজনৈতিক সমাবেশ নির্বাচনী রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে।
চট্টগ্রাম, ফেনী, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ—এই চারটি জেলা কেবল ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং রাজনৈতিক ইতিহাস, আবেগ, উত্তরাধিকার এবং ভোটের বাস্তবতায় গভীর তাৎপর্য বহন করে। এই সফরসূচি বিএনপির নির্বাচনী অভিযাত্রার একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা, যেখানে নেতৃত্বের দৃশ্যমানতা, কৌশলগত উপস্থিতি এবং রাজনৈতিক বার্তা একসঙ্গে মিলিত হয়েছে।একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এই কর্মসূচিকে দেখতে হলে এটিকে কেবল সমাবেশের তালিকা হিসেবে নয়, বরং সময়োপযোগী রাজনৈতিক কৌশল ও প্রতীকী বার্তার সমন্বয় হিসেবে মূল্যায়ন করতে হয়।
নির্বাচনের দোরগোড়ায় মাঠে ফেরার রাজনীতি
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রাজনৈতিক সমাবেশের ভাষা ও লক্ষ্য ভিন্ন হয়। এই সময় দলগুলো সাধারণত তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দেয়—নেতৃত্বের উপস্থিতি, সংগঠনের সক্রিয়তা এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। তারেক রহমানের আজকের এই সফরসূচি এই তিনটি দিকই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের রাজনীতি, আন্দোলন ও দাবি-দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা ভোটের রাজনীতিতে নিজেদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখাতে চাইছে। এই সফর মূলত সেই কৌশলেরই বহিঃপ্রকাশ।
চট্টগ্রাম: স্মৃতি, রাজনীতি ও রাষ্ট্রচিন্তার সংযোগ
চট্টগ্রাম দিয়ে দিনের কর্মসূচি শুরু হওয়ার মধ্যেই একটি গভীর রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে। এই নগরী বিএনপির জন্য শুধু একটি বড় ভোটকেন্দ্র নয়; এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের স্মৃতিবাহী স্থান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামেই পিতাকে হারান তারেক রহমান—যে ঘটনা তার ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক পরিচয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।এই প্রেক্ষাপটে আজ চট্টগ্রামে তারেক রহমানের উপস্থিতি নিছক আনুষ্ঠানিক নয়। সকালে নীতিনির্ধারণী আলোচনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বিএনপিকে একটি দায়িত্বশীল ও নীতিনির্ভর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছেন। নির্বাচনের আগে এই ধরনের আলোচনা ভোটারদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—বিএনপি কেবল সরকারবিরোধী অবস্থানে সীমাবদ্ধ নয়; তারা রাষ্ট্র পরিচালনার বিকল্প ভাবনাও তুলে ধরতে আগ্রহী।
এরপর পলোগ্রাউন্ড ময়দানের রাজনৈতিক সমাবেশ।
ঐতিহাসিকভাবে এই মাঠ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের কেন্দ্র। এখানে সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি একদিকে তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখাতে চায়, অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতির স্মৃতিবাহী নগরে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা তুলে ধরার সুযোগ পায়।
ফেনী: শেকড়ের টান ও আবেগের রাজনীতি
চট্টগ্রাম শেষে ফেনীতে যাত্রা এই সফরসূচিকে আরও ব্যক্তিগত মাত্রা দেয়। ফেনী তারেক রহমানের নানার বাড়ি—তার পারিবারিক শেকড়ের প্রতীক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেকড়, স্মৃতি ও পারিবারিক পরিচয়ের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে নির্বাচনের সময়।ফেনীর রাজনৈতিক বাস্তবতা বরাবরই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। এখানে সমাবেশের মাধ্যমে তারেক রহমান নিজেকে কেবল কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে নয়, বরং এলাকার সন্তান হিসেবেও উপস্থাপন করার সুযোগ পান। এই আবেগী সংযোগ ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে, যা নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হয়।
কুমিল্লা: বিস্তৃত উপস্থিতির কৌশল
কুমিল্লায় একদিনে তিনটি স্থানে—চৌদ্দগ্রাম, সুয়াগাজী ও দাউদকান্দি—রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজন বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এটি বড় কোনো একক সমাবেশের পরিবর্তে বিস্তৃত উপস্থিতির রাজনীতি।
ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত এবং রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময় এই অঞ্চলে একাধিক সমাবেশের মাধ্যমে বিএনপি গ্রাম ও মফস্বলভিত্তিক ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছাতে চাইছে। এতে তৃণমূল সংগঠন চাঙ্গা হয় এবং ভোটারদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়—দল মাঠে আছে, নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ: অর্থনীতি ও রাজধানীর প্রান্তভাগ
দিনের শেষ কর্মসূচি নারায়ণগঞ্জে হওয়াটাও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এই জেলা শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। কাঁচপুর বালুর মাঠের সমাবেশে বিএনপি দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও শ্রমিক অধিকারের মতো ইস্যু সামনে আনতে পারে।নারায়ণগঞ্জ ঢাকার প্রবেশদ্বার হওয়ায় এখানে সমাবেশ আয়োজন রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনীতিতে একটি প্রতীকী উপস্থিতি নির্দেশ করে। নির্বাচনের আগে রাজধানীর খুব কাছাকাছি এসে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন একটি সচেতন বার্তা বহন করে।
তারেক রহমান: নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের সমন্বয়
এই চার জেলা সফরের কেন্দ্রে রয়েছেন তারেক রহমান। তিনি কেবল বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান নন; তিনি একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারক। একদিকে চট্টগ্রামে পিতার হত্যার স্মৃতি, অন্যদিকে ফেনীতে পারিবারিক শেকড়—এই দুই বাস্তবতা তার রাজনীতিকে ইতিহাস ও আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে ধারাবাহিক সমাবেশের মাধ্যমে তিনি নেতাকর্মীদের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন—নেতৃত্ব সক্রিয়, নির্বাচনকে সামনে রেখে দল প্রস্তুত এবং মাঠের রাজনীতি থেকে তারা সরে দাঁড়ায়নি।
চ্যালেঞ্জ ও নির্বাচনী বাস্তবতা
তবে বাস্তবতা হলো, জনসমাবেশ যতই বড় হোক না কেন, নির্বাচনের ফল নির্ভর করে আরও অনেক বিষয়ের ওপর। নির্বাচনী পরিবেশ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, সংগঠনের সক্ষমতা এবং ভোটারদের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত ফল নির্ধারিত হয়।
বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো আবেগ ও উত্তরাধিকারের রাজনীতিকে কতটা বাস্তব ভোটের সমীকরণে রূপান্তর করা যায়। একই সঙ্গে ভাষা ও কৌশলের ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
পরিশেষে বলতে চাই, আজ ২৫ জানুয়ারি থেকে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি—এই সময়টাই বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির সবচেয়ে নির্ধারক অধ্যায়। তারেক রহমানের চার জেলা সফর বিএনপির নির্বাচনী অভিযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি কেবল রাজনৈতিক সমাবেশ নয়; এটি ইতিহাস, উত্তরাধিকার, আবেগ ও কৌশলের সমন্বিত প্রকাশ।
শেষ পর্যন্ত এই বার্তা কতটা ভোটে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী বাস্তবতার ওপর। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে এটুকু স্পষ্ট—বিএনপি নির্বাচনের ময়দানে শুধু উপস্থিত নয়, তারা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করছে, আর সেই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তারেক রহমান।

