শাল্লা (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধ
মেঃ দিলুয়ার হোসেন
প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর উজানের করাল গ্রাসে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার হাওর অঞ্চলের হাজার হাজার বোরো চাষি। গত দুদিনের বিরামহীন ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে ধেয়ে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে কৃষকের সারা বছরের ঘাম জড়ানো সোনালি স্বপ্ন এখন ঘোলা জলের নিচে। যে ধান গোলায় ওঠার কথা ছিল, সেই ধান এখন কর্দমাক্ত পানি থেকে উদ্ধারে চলছে এক জীবন-মরণ লড়াই।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শাল্লা উপজেলার একের পর এক হাওর এখন পানির নিচে। বিশেষ করে ছাগল আইয়্যার বন, ভাটি কাদ্দির হাওর, ডুপাডরার বন, জোয়ারিয়া হাওর, ইয়ারাবাদ গ্রামের মেদির বন, বৈশাখীর হাওর, বড় বন এবং কালী কোটা হাওরে বৃষ্টির পানি ও ঢল ঢুকে পরিস্থিতি শোচনীয় করে তুলেছে।
এদিকে ভেরামোহনার হাওর, ছায়ার হাওর, ভান্ডার হাওর, বরাম হাওর, উদগল হাওর, চব্বিশা গ্রামের পূর্বের হাওর, বারআইল্যার বন, কৈয়ার হাওর সহ অনেক হাওরে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ইতিমধ্যে ‘টেগুরিয়া’ (জলমগ্ন অবস্থা) তৈরি হয়েছে। কৃষকরা কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে -পাকা ধান কাটছেন। কোথাও নৌকা দিয়ে, কোথাও বা মাথায় ‘পায়চা’ নিয়ে বড় সড়কের ওপর ধান তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলছে।
নোয়াগাও গ্রামের কৃষক আব্দুল শহিদ বলেন মড়ার ওপর খারার ঘা
তবে ডাঙ্গায় ধান তুলেও শান্তি নেই। টানা বৃষ্টিতে ধান শুকানোর কোনো উপায় না থাকায় স্তূপ করে রাখা ধানে ইতিমধ্যে পচন ধরতে শুরু করেছে, অনেক জায়গায় ধানে চারা গজিয়ে গেছে।
চব্বিশা গ্রামের হতাশাগ্ৰস্ত এক কৃষক আলকাছ মিয়া ভেজা চোখে বলেন:
”পানি থৈ থৈ করছে, চোখের সামনে ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কাটতেও পারছি না, আর কাটলেও শুকাব কোথায়? খড় পচে যাওয়ায় গরুর খাবারের অভাব দেখা দিয়েছে। এখন না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় নেই, গরুগুলোও হয়তো বেচে দিতে হবে।”
ক্ষোভের সঙ্গে দাম পুর গ্রামের কৃষক আলাল ধানের বাজার দর নিয়ে বলেন, “বাজারে ধানের মণ মাত্র ৬৫০ টাকা। এই দামে বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না, ঋণের বোঝা শোধ করব কীভাবে?”
এদিকে বিরূপ আবহাওয়া, অন্যদিকে তীব্র শ্রমিক সংকট—এই দ্বিমুখী চাপে অসহায় কৃষকরা এখন কেবল সৃষ্টিকর্তার রহমতের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সার্বিক এই পরিস্থিতিতে শাল্লা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিৎ রায় বলেন:
”শাল্লায় ২১৭০০ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ করা হয়েছে। আবহাওয়া যদি ভালো থাকে আশা করি মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে। আমি কৃষক ভাইদের অনুরোধ করছি, ৮০ ভাগ ধান পাকা হলেই তারা যেন দ্রুত ধান কর্তন করে ফেলেন।”
শাল্লার বিভিন্ন হাওরে এখন কেবলই হাহাকার। তলিয়ে যাওয়া পাকা ধান আর কালো হয়ে যাওয়া খড় জানান দিচ্ছে, এবারের বৈশাখ এ অঞ্চলের কৃষকের জন্য উৎসবের নয়, বরং এক ভয়াবহ কষ্টের বার্তা নিয়ে এসেছে। সোনার ফসল যখন পানির নিচে পচছে, তখন কৃষকের নোনা জল আর বৃষ্টির জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে হাওরের দিগন্তে।

