মাহাদি হাসান জুয়েল, সহযোগী অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ঃ
সকালে ঘুম থেকে উঠে পত্রিকা খুলতেই চোখে পড়লো, দেশের একটি নামী চেইন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নকল ওষুধ বিক্রির অভিযোগে ধরা পড়েছে, আর সেই অপরাধে তাদের ২ লক্ষ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। খবরটি পড়ে মুহূর্তেই মনে হলো যেন আমাদের ভরসার ভিত্তিটাই কেঁপে উঠলো। একজন রোগীর কল্পনা করুন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। রোগের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ডাক্তার দেখালেন, অনেক টাকা দিয়ে পরীক্ষা করালেন, তারপর ডাক্তার যে ওষুধ লিখে দিলেন, নামি ফার্মেসি থেকে থেকে ওষুধ কিনলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন—এবার নিশ্চয়ই সুস্থ হবো। কিন্তু কয়েকদিন পরেও অবস্থার কোনও উন্নতি হলো না। বরং শরীরে অদ্ভুত দুর্বলতা দেখা দিলো। তিনি জানেনই না—যে ওষুধ খাচ্ছেন, তা আসলে ওষুধই নয়; তার অসুস্থতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়ার মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকের মিশ্রণ। নকল ওষুধের সর্বপ্রথম ক্ষতি এই বিশ্বাসের ধ্বংস—যে বিশ্বাসের উপর কোটি কোটি মানুষ তাদের জীবন নির্ভর করে।
দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বহুদিন ধরেই নানারকম সমস্যায় জর্জরিত। সরকারি হাসপাতালের সেবাহীনতা থেকে শুরু করে বেসরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত খরচ—সবকিছুই দীর্ঘদিন ধরে জনমানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যদি যোগ হয় নকল ওষুধের ভয়াবহতা, তাহলে মানুষের হতাশা যেন চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়। কারণ স্বাস্থ্য সেক্টর এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে প্রগাঢ় বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় শক্তি। রোগী একজন ডাক্তারকে বিশ্বাস করে, ডাক্তার একটি ওষুধ কোম্পানিকে বিশ্বাস করে, আর ফার্মেসি সেসব ওষুধ রোগীর হাতে তুলে দেয়। এই তিনস্তরের বিশ্বাসই একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দাঁড় করিয়ে রাখে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে—এই তিন স্তরের একটি বা একাধিক অংশই দুর্নীতির বিষে আক্রান্ত।
নকল ওষুধ মানে শুধু একটি পণ্যের মান কম থাকা নয়; এটি প্রভাব বিস্তার করে মানুষের শরীর, সমাজ, অর্থনীতি—সবকিছুর ওপর। একটি নকল অ্যান্টিবায়োটিক যদি আপনি খান, তা আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদের একটি, আর সেই বিপদকে আরও বাড়িয়ে তুলছে ভেজাল ও নকল ওষুধ। হৃৎপিণ্ডের অসুখে যদি কেউ নকল ওষুধ খায়, তবে হঠাৎ হার্টফেল পর্যন্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে ভেজাল ইনসুলিন বা ওষুধ মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। নকল ওষুধ মানুষের রোগ সারায় না; বরং রোগকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যেখানে আর চিকিৎসা করা যায় না। এর চেয়েও ভয়ংকর হলো—বেশিরভাগ মানুষ বুঝতেই পারে না যে তারা নকল ওষুধ খেয়েছে।
চিকিৎসকদের উপরেও এখন সাধারণ জনগণের অবিশ্বাস বাড়ছে। যদিও অধিকাংশ ডাক্তারই সৎ, নিবেদিতপ্রাণ ও মানবিক, কিন্তু কিছু মুষ্টিমেয় দুর্নীতিগ্রস্ত ডাক্তার পুরো পেশার সুনাম নষ্ট করে দিচ্ছে। রোগীর প্রেসক্রিপশনে অকারণে দামি ওষুধ লেখা, একটা নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ লিখে কমিশন নেয়া, কিংবা সঠিকভাবে রোগ বিশ্লেষণ না করেই বাণিজ্যিক প্রেসক্রিপশন দেয়া—এমন অভিযোগ জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে। মানুষ ভাবছে, ডাক্তার সত্যিই কি বুঝে লিখছেন? নাকি পিছনে কোনও অদৃশ্য হাত কাজ করছে? এই প্রশ্নগুলো সমাজে একটি ভরসাহীন পরিবেশ তৈরি করে—যা কোনও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বিপজ্জনক।
নকল ওষুধ ধরা পড়ার ঘটনা প্রকাশ্যে এলে সবাই আতঙ্কিত হয়, কিন্তু প্রশ্ন ওঠে—এগুলো এতদিন কোথায় ছিল? কীভাবে বাজারে আসলো? কারা এগুলো উৎপাদন করলো? কারা অনুমোদন দিলো? ওষুধ প্রশাসনের কাজ মান যাচাই করা, কিন্তু যদি তার ভেতরেই দুর্নীতি থাকে, যদি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়, যদি অর্থ ও ক্ষমতার কাছে দায়ীরা ছাড় পেয়ে যায়, তবে জনগণ কাকে বিশ্বাস করবে? এই প্রশ্নের উত্তর আজ আমাদের কাছে নেই। মানুষ জানতে চায়—রাষ্ট্র তার নাগরিককে সুরক্ষিত রাখতে ব্যর্থ হলো কেন?
দুর্নীতি যেন একটি মাকড়সার জালের মতো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঘিরে ফেলেছে। বড় বড় কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি মান, গবেষণা বা উদ্ভাবনে না হয়ে লুকোচুরি, ঘুষ, নকল ওষুধের মাধ্যমে হয়, তবে তা বোঝায়—ব্যবস্থা ভেতর থেকে পচে গেছে। একটি নকল ওষুধ উৎপাদন করতে যে নৈতিকতার অভাব লাগে, তা কোনও কোম্পানির জন্য, কোনও মানুষের জন্য বা কোনও রাষ্ট্রের জন্যই সহনীয় নয়। কারণ একজন ব্যবসায়ী যদি নকল জুতা বানায়—সেটা ক্ষতির হতে পারে, কিন্তু তবুও মানুষ বেঁচে থাকে। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী যদি নকল ওষুধ তৈরি করে—তা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিতে পারে, ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারে। এই অপরাধ ক্ষমার যোগ্য নয়।
নকল ওষুধের ছড়াছড়ি প্রমাণ করে যে স্বাস্থ্য খাতে শক্তিশালী তদারকি নেই। যা আছে, তা অনেকটাই কাগজে-কলমে। বাস্তবে আইন দরকার, কিন্তু আরও দরকার প্রয়োগ। বাজারে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন ওষুধ আসছে, আর ড্রাগ প্রশাসনের হাতে জনবল সীমিত। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতা কখনোই নকল ওষুধের জন্য অজুহাত হতে পারে না। আমাদের প্রশ্ন—তাহলে আমরা কোথায় যাবো? কোন প্রতিষ্ঠানের কাছে বিচার চাইবো? ঠকলে কাঁদবো কার কাছে?
আমরা চাই রাষ্ট্র দাঁড়াক জনগণের পাশে। চাই ডাক্তারদের ফেরাতে জনগণের ভরসা। চাই ওষুধ কোম্পানিগুলো বুঝতে পারুক—মানুষের জীবনকে ব্যবসার পণ্য বানানো যায় না। নকল ওষুধ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা কেবল আইনের প্রয়োগ নয়; এটি মানবতার দাবি। যতক্ষণ পর্যন্ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের এই অসহায়তা দূর হবে না। কিন্তু আমরা আশা করতে শিখেছি। এই সমাজে এখনও হাজারো সৎ ডাক্তার, নৈতিক ওষুধ কোম্পানি, দায়িত্বশীল সাংবাদিক, সচেতন নাগরিক আছে যারা এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে চান। জনগণের শক্তি যদি একত্রিত হয়, শাসনব্যবস্থা যদি জবাবদিহিমূলক হয়, এবং নকল ওষুধ কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়—তবে আবারও স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিশ্বাস ফিরে আসতে পারে।
বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার হলো নিরাপদ চিকিৎসা। এ অধিকার সুরক্ষিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, সমাজের দায়িত্ব।

