শামছুর রহমান মনিরামপুর প্রতিনিধি:
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনিরামপুরে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে সর্বশেষ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের রেকর্ড খুবই ভাল। তাছাড়া অনেক সময় রাজনীতিতে ঝুঁকি না দিলে বড় সফলতা ধরা দেয়না। স্বপন ভট্টাচার্য ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ। পদটি বেশ বড়। তবুও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে দল থেকে বহিষ্কার হলেও স্বতন্ত্র প্রতীক থাকায় এবং তিনি চেষ্টা করায় বিজয়ী হন। পরবর্তী নির্বাচনের আগে তাকে দলে ফিরিয়ে নিয়ে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী করা হয়। যদিও রাতের ভোটে তিনি বিজয়ী হন বলে অভিযোগ রয়েছে। আর বিজয়ী হওয়ায় তাকে মন্ত্রীত্বও দেয়া হয়।
আওয়ামী লীগের সময় সর্বশেষ নির্বাচনে আলহাজ্ব এস,এম ইয়াকুব আলী স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে রানিং মন্ত্রীকে পরাজিত করে বিজয়ী হন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে। এই নির্বাচনে ভিন্ন মতাদর্শের অনেক নেতা স্বপন ভট্টাচার্যকে সমর্থন করার চেষ্টা করলেও শুধু নৌকা প্রতীকের কারনে ভিন্ন মতের ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে তেমন একটা যাননি, বরং যারা গিয়েছিলেন তারা স্বতন্ত্র প্রতীকেই ভোট দেন। অধিকাংশ কেন্দ্রে দেখা গেছে হাতে গোনা কিছু ব্যক্তি ছাড়া অধিকাংশ ভোটাররা স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে যেতে।
এবারের নির্বাচনে এই উপজেলার আওয়ামী লীগ তথা নৌকা প্রতীকের বৃহৎ জোট ব্যাংকের মালিকদের ভোট দেয়ার মতো জায়গা নেই বললেই চলে। নৌকার ভোটাররা সরাসরি ধানের শীষ কিংবা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিতে তেমন একটা আগ্রহী হবে বলে কেউ বিশ্বাস করছেনা। এজন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে তারা ভোট দেয়ার একটা জায়গা পাবে।
তাছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিশাল ভোট ব্যাংক রয়েছে এই আসনে। এদের অধিকাংশরাই সাবেক এমপি খান টিপু সুলতান এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব এড শহীদ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বের কাছেই নিজেদের নিরাপদ মনে করেন,এটা বিভিন্ন সময় প্রমাণিত। পৌরসভার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনে শহীদ ইকবাল হোসেনের নির্বাচনের সময় সেইটা প্রমাণিত হয়েছে।
৫ আগষ্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর শহীদ ইকবাল হোসেন কিংবা তার পরিবারের সদস্যদের সাথে যদি ওই সম্প্রদায়ের কোন দূরত্ব সৃষ্টি হয়েও থাকে, তবে শহীদ ইকবাল হোসেনের মধ্যে যে ধরনের রাজনৈতিক পজেটিভ রাশি রয়েছে সেই দূরত্ব তিনি একটু চেষ্টা করলেই পূরণ হয়ে যাবে বলে অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে।
এদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে বিএনপির দীর্ঘ দিনের জোট থাকায় মুফতি ওয়াক্কাস পরপর তিনবার ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ বিহীন এবারের নির্বাচনে মুফতী ওয়াক্কাসের তুলনামূলক কম বয়সী ছেলেকে ধানের শীষ প্রতীক দেয়া হয়েছে। তিনি যদি বিজয়ী হন, তবে বিজয়ের রেকর্ডের কারনে অদূর ভবিষ্যতে বিএনপির কোন নেতা এই আসনে মনোনয়ন পাবে কিনা সন্দেহ রয়েছে। আবার জামায়াত ইসলাম যদি বিজয়ী হয়, তবে এই আসনে সব নির্বাচনেই সেইটার প্রভাব পড়বে এবং বিএনপি কোনঠাসা হয়ে যেতে পারে।
তাছাড়া রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী করার প্রতিবাদে শহীদ ইকবাল হোসেনের পক্ষে বিএনপি টানা কয়েকদিন ধরে নজিরবিহীন জনসমাগম ঘটিয়েছে। এরফলে কেন্দ্র থেকে সমন্বয় করা হলেও এতো কর্মী সমর্থককে পূণরায় রশীদ বিন ওয়াক্কাসের পক্ষে নেয়াটা রীতিমতো নেতাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাড়াবে। সব মিলিয়ে একটা জটিল সমীকরণে এসে দাড়িয়েছে।
নির্বাচন করার ক্ষেত্রেও শহীদ ইকবাল হোসেনের জন্য অংকটি আরো জটিল। কারণ তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহার না করলে দল থেকে নিশ্চিত বহিষ্কার হবেন এবং পরাজিত হলে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার প্রায় সমাপ্তির দিকে ধাপিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিজয় ছাড়া অন্য কোন অপশন হাতে থাকবেনা বলে মনে করছেন রাজনীতি ভাবাপন্নরা। আবার তিনি যদি উপজেলা, পৌর এবং ইউনিয়ন কমিটির সুপার ফাইভ নেতাদের নিয়ে বসেন এবং নিজেদের মধ্যে লিখিত অঙ্গীকারনামা করেন যে, বহিষ্কার হলে কিংবা পদত্যাগ করলে সবাই একই সাথে করবো, তাহলে ফলাফল পজেটিভ হবার সম্ভাবনা বেশি। যেমনটি ঝিনাইদহের একটি আসনের নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
শহীদ ইকবাল হোসেনের প্রতি দলীয় নেতাকর্মী সমর্থক এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহ সৃষ্টি করে দিয়েছেন মূলত দলটির হাই কমান্ড। কারণ প্রথমবার মনোনয়ন ঘোষণার সময় দলটি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলছিলেন যশোর ৫ হোল্ড অর্থাৎ স্থগিত। তখন এই আসনের দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিলেন যে, আসনটি জোটকে দিতে পারে। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় প্রার্থী হিসেবে শহীদ ইকবাল হোসেনের নাম ঘোষণা করায় তিনি ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েন।
কিন্তু সর্বশেষ শহীদ ইকবাল হোসেনকে বাদ দিয়ে হঠাৎ করে রশীদ বিন ওয়াক্কাসের নাম ঘোষণা করায় বিএনপির নেতা কর্মী সমর্থকদের হৃদয়ে ব্যাপক আঘাত লাগে এবং ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে অনেকে বলছেন, শেষ বয়সে চরম বেইজ্জত করায় শহীদ ইকবাল হোসেনের উচিৎ নির্বাচনে লড়াই করা এবং জীবনের সকল রাজনৈতিক প্রজ্ঞা প্রয়োগ পূর্বক ভোটের রাজনীতিতে বিজয়ী হওয়া। আবার কেউ কেউ বলছেন, তিনি দলের সভাপতি এবং দল ক্ষমতায় যাওয়ার দ্বারপ্রান্তে। কাজেই এমপি যিনিই হোকনা কেন সভাপতি হিসেবে তার নিজস্ব ক্ষমতা,সম্মান তো থাকবে, এজন্য নির্বান না করা।
অন্যদিকে, একটা অংশের মতে, রশীদ বিন ওয়াক্কাস এমপি হলে অদূর ভবিষ্যতে বিএনপি থেকে কারো মনোনয়ন পাওয়া রীতিমতো অসম্ভব, আবার জামায়াতের এমপি হলে বিএনপির সাংগঠনিক ক্ষতি। সেক্ষেত্রে শহীদ ইকবাল হোসেন যদি কোন কারনে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেন তবে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সাধারণ ভোটাররা মিলে তৃতীয় কাউকে অর্থাৎ লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী এম এ হালিমকে বিজয়ী করার মাধ্যমে সাপও মরলো লাঠিও ঠিক রইলো প্রবাদ বাক্যকে বাস্তবে রূপ দিতেও পারে অথবা তেমনটা করাই উচিৎ বলে মনে করেন অনেকে।

