• আজকের পত্রিকা
  • ই-পেপার
  • আর্কাইভ
  • কনভার্টার
  • অ্যাপস
  • সমাপ্তি খামেনি অধ্যায়: ইরান ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রভাব 

     swadhinshomoy 
    02nd Mar 2026 2:41 pm  |  অনলাইন সংস্করণ Print

    ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

    বিশ্ব রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সম্প্রতি ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে সংঘটিত ঘটনাগুলো আবারও এই অঞ্চলকে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কেন্দ্রে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং তার সঙ্গে জড়িত সামরিক ও নিরাপত্তা কমান্ডারদের নিহত হওয়া কেবল ইরানেই নয়, পুরো বিশ্বে রাজনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক প্রভাব ফেলেছে।

    ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হন। এই হামলায় তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান।

    যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দাবি অনুযায়ী, খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তারা উন্নত গোয়েন্দা নজর এড়িয়ে যেতে পারেননি। খামেনি ১৯৮৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের স্থপতি রুহুল্লাহ খোমিনির মৃত্যুর পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
    খোমিনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের রাজনৈতিক কাঠামো গঠিত হয়েছিল। কিন্তু খামেনি ক্ষমতায় আসার পর সেই কাঠামোকে আধুনিক সামরিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করেছেন।

    আইআরজিসি বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে তিনি কেবল আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে রাখেননি, বরং এটিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে রূপ দেন। একই সঙ্গে তিনি “প্রতিরোধ অর্থনীতি” ধারণা জোরদার করেন, যা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও ইরানকে স্বনির্ভর রাখতে সাহায্য করে।

    খামেনির শাসনকালীন নীতিমালায় যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বদা প্রধান বৈরী শক্তি হিসেবে দেখা হয়েছে।

    তার দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতা এবং পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি অবিশ্বাস মূলত ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় থেকে গড়ে উঠেছে। সেই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অভিজ্ঞতা খামেনিকে সচেতন করেছে যে ইরানকে বহিরাগত হুমকি থেকে রক্ষা করতে হবে। এই নীতি বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে ইরান সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

    তবে খামেনির শাসনকালীন নীতি সবসময় চ্যালেঞ্জমুক্ত ছিল না। ২০০৯ সালে নির্বাচনী কারচুপি নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে নারীদের অধিকার নিয়ে দেশজুড়ে চলা প্রতিবাদগুলো প্রমাণ করে যে জনগণের প্রত্যাশা ও সরকারের অবস্থান মাঝে মাঝে সংঘর্ষে প্রবেশ করেছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে জানুয়ারিতে দেশব্যাপী শুরু হওয়া বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন। এই বিক্ষোভ সরকারকে সহিংস পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে, যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বড় দমন অভিযান হিসেবে বিবেচিত হয়।

    আন্তর্জাতিক পর্যালোচকদের মতে, খামেনি পশ্চিমা শক্তির প্রতি কঠোর মনোভাব ও বিচ্ছিন্ন নীতির কারণে সাধারণ ইরানিদের বড় মূল্য দিতে হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ভেলি নাসর বিশ্লেষণ করেন, “জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে অনড় থাকার জন্য ইরানিদের চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জনগণ এই স্বাধীনতার প্রজ্ঞায় বিশ্বাস হারিয়েছে।

    অর্থাৎ রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

    ইরানের সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো কেবল দেশীয় রাজনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

    করাচিতে মার্কিন দূতাবাসের কাছে সহিংস সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হওয়া, বিক্ষোভ ও পুলিশের তৎপরতা, এবং মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।

    ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নতুন কমান্ডার নিয়োগও এই অস্থির পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

    আহমদ বাহিদিকে আইআরজিসি’র নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যদিও তার বিরুদ্ধে ২০২২ সালের বিক্ষোভ দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে, তবু ইরান সরকার তা অগ্রাহ্য করেছে।

    খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সর্ষণীয় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

    আলোচনায় উঠে এসেছে পাঁচজন সম্ভাব্য প্রার্থী। বিশেষ করে মোজতাবা খামেনির নাম আলোচনায় এসেছে, যদিও ইরানের শিয়া শাসনব্যবস্থায় পিতা-পুত্রের উত্তরাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তবে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাবের কারণে তার নাম উল্লেখযোগ্য।

    উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে হামলার খবরও মিলেছে। সৌদি যুবরাজ, চীন ও রাশিয়া ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও কিছু মধ্যপ্রাচ্য রাষ্ট্রের অবস্থান ইরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জটিলতা এবং কূটনৈতিক সংযোগের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
    ইরানের ভবিষ্যৎ কেবল দেশীয় রাজনীতিই নয়, আন্তর্জাতিক শক্তি ভারসাম্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

    চীন, সৌদি আরব, আমিরাত ও রাশিয়ার কৌশলগত স্বার্থ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। মধ্যপ্রাচ্যে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক বা সামরিক পরিবর্তন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, নিরাপত্তা নীতি ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলকে প্রভাবিত করতে পারে।

    তবে এই জটিল পরিস্থিতি কেবল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা নেতৃত্বের উপর নির্ভর করে না। সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ও দাবি ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খামেনির নীতিমালা ও নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক অবস্থান কখনও কখনও জনগণের বাস্তবতার সঙ্গে মিলত না। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক উত্তেজনা সামাল দেওয়া দুটোই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

    ইরানের সাম্প্রতিক সংকট এবং খামেনির মৃত্যু আন্তর্জাতিক মিডিয়া, গবেষক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ন পর্যবেক্ষণের বিষয়। এটি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কেবল সামরিক শক্তি বা ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনগণের প্রত্যাশার সমন্বয়ও এতে প্রভাব ফেলে।

    পরিশেষে বলা যায়, খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। এই ঘটনায় ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, সামরিক নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে এই ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে একটি শিক্ষণীয় দিকও তুলে ধরে—যে কোনো দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে সম্পর্কিত।
    মধ্যপ্রাচ্য যেমন অতীতেও বৈশ্বিক শক্তির খেলা ছিল, তেমনি বর্তমানেও এখানে সংঘর্ষ, কূটনীতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত। খামেনির মৃত্যুর পর ইরান কতটা স্থিতিশীল থাকতে পারে এবং তার নতুন নেতৃত্ব কিভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, সেটিই পরবর্তী কয়েক মাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।

    আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে কেবল ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি একটি শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, যার স্থিতিশীলতা এবং নেতৃত্বের পরিবর্তন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। খামেনির সময়কাল শেষ হলেও, তার নীতিমালা, রাজনৈতিক কৌশল এবং আঞ্চলিক প্রভাব ইরানের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঠ বয়ে আনছে।

    উপরের নিউজটি মাঠ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করা এ বিষয়ে কোন দ্বিমত থাকলে প্রমাণসহ dailyswadhinshomoy@gmail.com এ ইমেইল করে আমাদেরকে জানান অথবা আমাদের +88 01407028129 নাম্বারে হোয়াটসঅ্যাপ করুন।
    আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
    Jugantor Logo
    ফজর ৫:০৫
    জোহর ১১:৪৬
    আসর ৪:০৮
    মাগরিব ৫:১১
    ইশা ৬:২৬
    সূর্যাস্ত: ৫:১১ সূর্যোদয় : ৬:২১

    আর্কাইভ

    March 2026
    S M T W T F S
    1234567
    891011121314
    15161718192021
    22232425262728
    293031