ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
আজ বুধবার ৪ মার্চ ২০২৬, বিশ্ব যৌন নিপীড়ন বিরোধী দিবস। দিনটি মূলত নারীর ও শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা প্রতিরোধ এবং সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে উদযাপিত হয়। তবে দেশের সামাজিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ এখনও সীমিত। প্রতিদিন নারীর ও শিশুরা নানা পরিবেশে—ঘর, রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন এবং জনসমাগমস্থলে—যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
শিকার ব্যক্তিরা সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ ও ভয়ের কারণে অভিযোগ করতে দ্বিধা বোধ করেন। ফলে অপরাধ চাপা পড়ে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। যারা প্রতিবাদ করেন, তারা প্রায়ই হুমকি, হামলা বা শারীরিক নির্যাতনের সম্মুখীন হন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে যৌন নিপীড়ন কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি গভীর সামাজিক সংকট।
২০২৫–২৬ সালের ভয়াবহ পরিসংখ্যান
নারী নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন:- ৮২৩ নারী শিকার; এর মধ্যে ২৩১ ধর্ষণ, ১১৭ দলবদ্ধ ধর্ষণ, ১৬ ধর্ষণের পর হত্যা, ১১০ ধর্ষণচেষ্টা, ১৪৯ যৌন হয়রানি, ১০ এসিড নিক্ষেপ, ৭২ প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণ, ৫১২ নারী আত্মহত্যা, ১৫ নারী অপহৃত, ২২ নারী নিখোঁজ।
শিশু ও কিশোরী:- ৭৬৮ শিশু ও কিশোরী যৌন নিপীড়নের শিকার; এর মধ্যে ৪৩২ ধর্ষণ, ৬৪ দলবদ্ধ ধর্ষণ, ২৫ ধর্ষণের পর হত্যা, ৪ ধর্ষণের পর আত্মহত্যা, ১৩০ যৌন হয়রানি, ১১৩ ধর্ষণচেষ্টা।
পারিবারিক সহিংসতা ও নবজাতক পরিত্যক্ত:- ৫৮০ নারী পারিবারিক নির্যাতন, ২৯২ নিহত, ১৪২ আত্মহত্যা; ১৫০ নারী যৌতুকজনিত সহিংসতার শিকার, ৭০ নারী নিহত;
৯১ নবজাতক পরিত্যক্ত: ২১ জীবিত, ৭০ মৃত।
* শিক্ষাঙ্গন:- শিক্ষার্থীর ৫৩% যৌন হয়রানির শিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৬% ছাত্রী যৌন হয়রানি ভোগ: সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৭%, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৬৬%, মেডিকেল কলেজ ৫৪%।
বিভিন্ন পেশায় ১৯% নারী যৌন হয়রানির শিকার।
অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী ও সালিশের মাধ্যমে মামলা বন্ধ করা হয়েছে। এটি আইনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং অপরাধীদের প্ররোচনা বাড়ায়। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, যৌন নিপীড়ন এখন শুধু আইনগত নয়, বরং গভীর সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয়।
সমস্যার মূল কারণ
১. সামাজিক লজ্জা ও নীরবতা: শিকাররা পারিবারিক চাপ ও ভয়ের কারণে অভিযোগ করতে দ্বিধা বোধ করেন।
২. সালিশ ও প্রভাবশালীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ: প্রভাবশালীরা প্রায়ই তদন্ত ও বিচার বাধাগ্রস্ত করেন।
৩. শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব: যৌন শিক্ষা ও সতর্কতার অভাবে শিশু, কিশোরী ও যুবসমাজ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছেন।
৪. আইনের যথাযথ প্রয়োগে ব্যর্থতা: অপরাধীদের শাস্তি না দেওয়ায় নতুন অপরাধের প্ররোচনা তৈরি হয়।
৫. সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের অবনতি: পারিবারিক ও সামাজিক শিক্ষার অভাব যৌন সহিংসতার বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে।
প্রতিরোধের মূল উপায়
শিক্ষা ও সচেতনতা
* স্কুল, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে পাঠ্যক্রম চালু করা।
* শিশু ও যুবসমাজকে আত্মসম্মান, সংযম ও সামাজিক দায়িত্ব শেখানো।
* সচেতন প্রচারণার মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের প্রভাব সম্পর্কে মানুষকে শিক্ষা দেওয়া।
আইনের যথাযথ প্রয়োগ
* সালিশ বা প্রভাবশালীদের মাধ্যমে মামলা বন্ধ বন্ধ করতে হবে।
* অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
* তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও দ্রুতগতিতে চালু রাখতে হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও সহায়তা
* পরিবার ও প্রতিবেশীর সক্রিয় সহায়তা বাড়াতে হবে।
* কমিউনিটি পর্যায়ে নারী ও শিশু নিরাপত্তার জন্য সচেতনতা কর্মসূচি।
* মিডিয়ার মাধ্যমে সতর্কবার্তা ও সামাজিক নৈতিকতা প্রচার।
পরিবারিক ও সামাজিক শিক্ষা
* পারিবারিক শিক্ষার মাধ্যমে শিশু ও যুবসমাজে নৈতিক চেতনা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।
* শিশুদের আত্মরক্ষা, নিরাপদ আচরণ ও শালীন পোশাকের সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
* মানসম্মত আচরণ ও সামাজিক সুরক্ষা কৌশল শেখানো অপরিহার্য।
শিক্ষামূলক উদ্যোগ
* যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি প্রতিরোধে ওয়ার্কশপ, সেমিনার এবং কমিউনিটি প্রোগ্রাম।
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও কার্যক্রম জোরদার।
* শিশু ও কিশোরীর জন্য হেল্পলাইন, সেফ স্পেস এবং পরামর্শ কেন্দ্র তৈরি।
নতুন সরকারের দায়িত্ব
নতুন সরকার নারীর ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ দায়িত্ব বহন করছে। করণীয় হলো:
* আইন ও বিচার ব্যবস্থা শক্ত করা: মামলা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি, সালিশ বা প্রভাবশালীদের অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ, অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
* শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা: স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটিতে যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ শিক্ষা কার্যকর করা, যুবসমাজকে আত্মসম্মান ও সচেতনতা শেখানো।
* সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: কমিউনিটি পর্যায়ে নিরাপদ পরিবেশ, হেল্পলাইন, সেফ স্পেস ও পরামর্শ কেন্দ্র।
* প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ: মিডিয়া ও সচেতন প্রচারণার মাধ্যমে যৌন নিপীড়নের ক্ষতিকর প্রভাব হ্রাস এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি কার্যকর করা।
শুধু এই সংমিশ্রণ—আইন, সামাজিক সচেতনতা, পরিবারিক শিক্ষা এবং সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ—নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নিশ্চিত করতে পারে।
পরিশেষে বলতে চাই, ২০২৫–২৬ সালের ভয়াবহ পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে আইন, প্রচারণা বা প্রতীকী পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৈতিক চেতনা, সামাজিক সচেতনতা, পরিবারিক শিক্ষা, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং সরকারের সক্রিয় উদ্যোগ।
সমাজের প্রতিটি স্তর—শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, প্রশাসন এবং মিডিয়া—মিলে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। বিশ্ব যৌন নিপীড়ন বিরোধী দিবস শুধুমাত্র প্রতীকী নয়; এটি সামাজিক দায়বদ্ধতা, নিরাপত্তা এবং ন্যায়ের বার্তা বহন করে। নারীর ও শিশুর নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে তোলার জন্য এই বার্তা আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে।

