স্টাফ রিপোর্টার আফজল হুসাইন
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পরিচিত ‘মানবিক ডাক্তার’ হিসেবে খ্যাত চিকিৎসক ডা. শামীম ভুঁইয়া (২৯)-কে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে উপজেলার পৌর এলাকার কামারকোনা গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কটিয়াদী মডেল থানা পুলিশ।
ডা. শামীম ভুঁইয়া মৃত আলম ভুঁইয়ার ছেলে। তার গ্রেপ্তারের পর স্থানীয় বাসিন্দা, জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা দাবি করেছেন, তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্র-জনতার পাশে থেকে আহতদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন এবং আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, জুলাই আন্দোলনের সময় আহত অনেক ব্যক্তি সরকারি হাসপাতালে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ায় ডা. শামীম নিজ উদ্যোগে তাদের চিকিৎসা দেন। দীর্ঘদিন ধরে অর্ধশতাধিক ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে ‘মানবিক ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কয়েক দিন আগেও জুলাই শহীদদের স্মরণে একটি বিনামূল্যের চিকিৎসা ক্যাম্প পরিচালনা করেন।
তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের প্রকাশ্য পোস্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২ আগস্ট তিনি লিখেছিলেন, “প্রিয় দেশবাসী, ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসা দিন। ওরা আপনাদের ভাইবোন-সন্তান।” একই বছরের ৫ আগস্ট তিনি লিখেছিলেন, “দেশ স্বাধীন।”
গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধা জহিরুল ইসলাম ও আফজল হুসাইন বলেন, ডা. শামীম শুধু আন্দোলনের সমর্থকই নন, আহতদের চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন। তাদের ভাষ্য, তিনি অনেক আন্দোলনকারীকে মানসিকভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। তারা তার মুক্তি দাবি করেন এবং অভিযোগ করেন, ভুল তথ্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে তাকে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা আব্দুল্লাহ আল রুমান বলেন, ডা. শামীম আন্দোলনের শুরু থেকেই ছাত্র-জনতার পাশে ছিলেন। আহতদের চিকিৎসাসেবায় তার অবদান রয়েছে। তাই তার গ্রেপ্তার উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কটিয়াদী উপজেলা সভাপতি মাওলানা তোফাজ্জল হোসেন রশীদী বলেন, ডা. শামীম একজন সৎ, মানবিক ও সমাজসেবী মানুষ। তিনি কখনো সমাজ বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে জানা নেই। তার দ্রুত মুক্তি কামনা করেন তিনি।
পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব মো. নাছিম বলেন, ডা. শামীমকে তিনি সবসময়ই জুলাই আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে দেখেছেন। কোনো আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তার জানা নেই।
জেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি মুশফিকুর রহমান উবাইদু এবং জালালপুর ইউনিয়ন যুবদল নেতা আরিফুল ইসলাম সবুজ বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগতভাবে প্রমাণিত অভিযোগ না থাকলে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় বা পদবির কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা উচিত নয়। তাদের মতে, ডা. শামীম সমাজে একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত এবং জুলাই আন্দোলনে তার ভূমিকা স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত।
পুলিশ হেফাজতে সাংবাদিকদের কাছে ডা. শামীম ভুঁইয়া বলেন, তিনি কখনো কোনো আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তার দাবি, তাকে না জানিয়েই একসময় পৌর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তিনি কখনো সক্রিয় রাজনীতি করেননি। বরং বিবেকের তাড়নায় জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট একটি মহলের প্রতিহিংসার কারণেই তাকে এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ডা. শামীম ভুঁইয়া পৌর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
তবে মামলার অভিযোগের বিষয়ে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তাকে দোষী বলা যায় না।

