পর্যটন আজ কেবল একটি বিনোদন বা অবকাশযাপনমূলক খাত নয়—এটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী পর্যটনকে বলা হয় “শান্তির শিল্প” ও “অর্থনীতির অনুঘটক”, কারণ এটি একদিকে যেমন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, তেমনি অন্যদিকে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।
বিশ্বের দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো—যেমন মৌরিশাস, মালদ্বীপ, ফিজি, কিংবা বাহামা—পর্যটনের ওপর নির্ভর করে তাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান প্রায় ১০.৫ শতাংশ এবং এতে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। এ খাতের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিনোদন, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়—যা একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতও একইভাবে সম্ভাবনাময় ছিল, এখনো আছে। আমাদের পাহাড়, সমুদ্র, নদী, বন, ঐতিহাসিক স্থান ও লোকসংস্কৃতি—সবকিছুই পর্যটনের জন্য অনন্য সম্পদ। অথচ দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই বিশাল সম্ভাবনাময় শিল্পটি এখনো কাঠামোগত উন্নয়ন ও পরিকল্পনার অভাবে পিছিয়ে আছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় কমেছে প্রায় ১৫৯ কোটি টাকার সমপরিমাণ, যা এই খাতের সংকট স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিদেশি পর্যটকদের আগমন কমে যাওয়ায় পর্যটন এখন মূলত দেশীয় ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সুসংহত জাতীয় পর্যটননীতি, যা টেকসই উন্নয়ন, নিরাপত্তা, প্রচার, অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে জোর দেবে। পর্যটন খাতকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে, যাতে এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি শক্তিশালী খাতে পরিণত হয়।
বিশ্বের অনেক দেশ কেবল পর্যটনকেই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে—আমরাও পারি। যদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিতভাবে পর্যটনশিল্পকে বিকশিত করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারা আমূল বদলে যেতে পারে। কক্সবাজার থেকে কুয়াকাটা, সুন্দরবন থেকে সিলেট—সবকিছুই আমাদের হাতে থাকা এক অমূল্য সম্পদ। এই সম্পদকে কাজে লাগানোই এখন সময়ের দাবি।

