আ খ তা র হো সা ই ন খা নঃ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরের ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নে এই খাতগুলো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এই অগ্রযাত্রা টেকসই ও জনকল্যাণমুখী করতে হলে প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। সুশাসনের অভাব কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি ও সমাজের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সুশাসন বলতে সাধারণত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন, ন্যায়পরায়ণতা, দক্ষতা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বোঝায়। প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসনের অর্থ হলো—মালিকানা, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন এবং নৈতিক ও পেশাদার কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করা। যেখানে সিদ্ধান্ত হবে তথ্যভিত্তিক, আর্থিক ব্যবস্থাপনা হবে স্বচ্ছ এবং প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত থাকবে।
সুশাসনের সুফল বহুমাত্রিক। সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ে, কর্মীদের মধ্যে পেশাগত নিরাপত্তা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হয়, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা জোরদার হয়। অপরদিকে সুশাসনের অভাব কর্পোরেট অনিয়ম, আর্থিক কেলেঙ্কারি, শ্রম অসন্তোষ এবং শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কর্পোরেট গভর্ন্যান্স চর্চার চেষ্টা করছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসনের চিত্র এখনও আশানুরূপ নয়। বহু ক্ষেত্রে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সুস্পষ্ট সীমারেখা অনুপস্থিত। পরিবারকেন্দ্রিক মালিকানা কাঠামোর কারণে পেশাদার ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতা দেখা যায়।
নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া, আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতার ঘাটতি, শ্রম আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং কর্মপরিবেশে নিরাপত্তার অভাব—এসব সমস্যা এখনও অনেক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান। এর ফলে একদিকে কর্মীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো স্বচ্ছতার অভাব। আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অস্বচ্ছতা দুর্নীতি ও অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি জবাবদিহিতার দুর্বলতা একটি বড় সমস্যা। সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হলেও অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় না, ফলে দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পেশাদার মানবসম্পদের সংকট। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলার পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিক লাভের দিকে বেশি মনোযোগী থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রম অধিকার ও কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যা, যা সামাজিক অস্থিরতা ও শিল্প বিরোধের জন্ম দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কয়েকটি করণীয় বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রথমত, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি স্বচ্ছ ও শক্তিশালী কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পরিচালনা পর্ষদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে এবং স্বাধীন ও যোগ্য পরিচালক অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি। নিয়মিত অডিট, নিরপেক্ষ আর্থিক প্রতিবেদন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দায় নির্ধারণের সংস্কৃতি চালু করতে হবে।
তৃতীয়ত, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। পেশাদার মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ালে প্রতিষ্ঠান যেমন লাভবান হবে, তেমনি সামগ্রিকভাবে কর্পোরেট সংস্কৃতিও উন্নত হবে।
চতুর্থত, শ্রম অধিকার ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সুশাসনের অপরিহার্য অংশ। ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং মানবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হলে কর্মীদের মধ্যে আস্থা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
এক্ষেত্রে সরকারের ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর আইন প্রণয়ন, তার কঠোর প্রয়োগ, নিয়মিত তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীল নীতি গ্রহণের মাধ্যমে প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন জোরদার করা সম্ভব। একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ তৈরি করাও সরকারের দায়িত্ব।
সবশেষে বলা যায়, প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টরে সুশাসন কোনো বিলাসিতা নয়; এটি টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী কর্পোরেট সংস্কৃতি। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে যদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে প্রাইভেট ও কর্পোরেট সেক্টর দেশের উন্নয়নে আরও কার্যকর ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারবে।

