আহম্মেদুল কবির, কুড়িগ্রামঃ
কুড়িগ্রামের শীত এখন আর মৌসুমি দুর্ভোগ নয়—এটি রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে। কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষ, যাদের জীবন-জীবিকা থমকে গেছে।
আজ ৬ জানুয়ারি মঙ্গলবার রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার জানান, জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং বাতাসের আর্দ্রতা ৮৯ শতাংশ। এই আবহাওয়ার প্রভাবে শ্রমজীবী মানুষের কাজ কমে গেছে, অনেকের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৪৬৯টি চরে বসবাস করে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। দিনমজুর, জেলে ও কৃষিশ্রমিক নির্ভর এসব জনপদের মানুষের কাছে শীত মানেই অনাহার, অসুখ আর অনিশ্চিত জীবনের ভয়।
কম্বলের সংখ্যা মানুষের তুলনায় অতি নগণ্য
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, তার ইউনিয়নের প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের মধ্যে ১৬ হাজারই বসবাস করেন চরাঞ্চলে। অথচ এ বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০০টি কম্বল।
একই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড কালির আলগা চরের ইউপি সদস্য হোসেন আলী বলেন, তার ওয়ার্ডে প্রায় ৩ হাজার মানুষ বসবাস করলেও তিনি পেয়েছেন মাত্র ৪টি কম্বল। “এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য ৪টি কম্বল বিতরণ করা আমার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব,”বলে জানান তিনি।
চেয়ারম্যান আব্দুল গফুরের তথ্যমতে, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড পার্বতীপুর চরে দেওয়া হয়েছে ৬টি কম্বল, ৮ নম্বর ওয়ার্ড গোয়াইলপুরী চরে দেওয়া হয়েছে ৬টি কম্বল, ৯ নম্বর ওয়ার্ড ঝুনকার চরে দেওয়া হয়েছে ৭টি কম্বল।
শীতে কাহিল স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যান নিতে গেলে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, জেলায় ২৯৭টি ক্লিনিক এবং ৯ উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তবে এ বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে দাবি করেছেন কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু। তিনি বলেন, “এই আপদকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবার যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, তা বাস্তবে চরাঞ্চলে দেখা যাচ্ছে না। তিনি যাত্রাপুর ইউপির ঝুনকারচর ৯ নাম্বার ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রায়হান কবিরের বক্তব্য কোড করে বলেন, ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, তার এলাকায় ১টি মাত্র কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও স্থানীয়রা চিকিৎসক কিংবা কর্মচারীদের তেমন চেনেন না। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই ক্লিনিকের চিকিৎসক আব্দুল আউয়াল নিয়মিত চিকিৎসা সেবা দেন না। শুধু ঝুনকারচর নয়, ভগবতীপুরসহ ইউনিয়নের অন্যান্য চরাঞ্চলেও কার্যত স্বাস্থ্যসেবা নেই বললেই চলে।
একই ভাবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার চর উন্নয়ন কমিটির সভাপতি রফিকুল ইসলাম জানান, কালজানি ও দুধকুমার নদী অববাহিকার শিলখুড়ি, তিলাই, চর ভূরুঙ্গামাড়ী, সোনাহাটসহ অন্তত ১০টি ইউনিয়নে হাজার হাজার মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। তারাও স্বাস্থ্যসেবার ঝুঁকিতে রয়েছে। একদিকে চিকিৎসা নেই, অপরদিকে কাজ নেই। তিনি সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
চিলমারীর অঞ্চলের নয়ারহাট, রানীগঞ্জ, উলিপুর উপজেলার হাতিয়া, সাহেবের আলগা, সদর উপজেলার মোগলবাসা, বেগমগঞ্জ, নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া, নারায়নপুর ইউনিয়নের চলাঞ্চলের মানুষজন এমনকি সদর উপজেলার ছিন্নমূল মানুষজন স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে। বলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান।
শীতকষ্ট নিরসনে সরকার থেকে ত্রাণ কার্যক্রম চললেও চাহিদা অনেক বেশি
কুড়িগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন জানান, এ পর্যন্ত জেলার নয় উপজেলায় ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কম্বল কেনার জন্য আরও ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে।
তবে চরবাসীর সংখ্যা ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই সহায়তা যে অপ্রতুল—তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
অপরদিকে জেলার কৃষিতেও দেখা দিয়েছে বিপর্যয়। বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, অব্যাহত শীতের প্রভাবে জেলায় ৫৪ হেক্টর বোরো ধানের বীজতলা এবং ১ হেক্টর আলুর বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলার পরিচর্যার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে সূর্যের আলো স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

