সোহেল খান দূর্জয় নেত্রকোনা : নেত্রকোনা-৩ (আটপাড়া-কেন্দুয়া) আসনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ইতিহাস,ঐতিহ্য ও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বরাবরই আলোচনায় থাকে এই আসনটি।পথঘাট,হাটবাজার থেকে শুরু করে চায়ের দোকান—সবখানেই চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, কার হাতে যাচ্ছে আসনটির দায়িত্ব। এসব নিয়েই কৌতূহল সাধারণ মানুষের। ১৯৮৪ সালে আসনটি গঠনের পর থেকে এখানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবস্থান করছে। বর্তমানে এ আসনে বিএনপি শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ফলে এবারও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হবে বলে আশা ভোটারদের। নেত্রকোনা-৩ আসনে মোট ভোটারসংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ৭০০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৫, মহিলা ২ লাখ ৪ হাজার ৬২৬ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৯ জন। চার লাখের বেশি ভোটারের এই আসনে কৃষি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম পরিবর্তন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল, জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী মো. খাইরুল কবির নিয়োগী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. আবুল হোসেন তালুকদার, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের প্রার্থী মো. শামসুদ্দোহা এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মো. জাকির হোসেনও মাঠে রয়েছেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম হিলালী আওয়ামী লীগের শাসনামলে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি অর্ধশতাধিক মামলার ভুক্তভোগী। ২০০৬, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে এই আসনে মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের পাশে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ায় এলাকায় তার বেশ জনপ্রিয়তা রয়েছে। তবে বিএনপির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূঁইয়া দুলাল। মনোনয়ন ঘোষণার আগে তিনি ধানের শীষের আশায় ব্যাপক গণসংযোগ চালান। মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়ে বৈধতা পান তিনি।দুলাল জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও কেন্দুয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া তিনি কেন্দুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, কেন্দুয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র এবং কান্দিউড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করায় এই আসনে তারও শক্ত অবস্থান রয়েছে। বিএনপির এই বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে দলটির ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে এই আসনে বিএনপির ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বিএনপির দুই প্রার্থীর মধ্য থেকে যে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পথটি খুব সহজ থাকছে না। আর সেই সুযোগে জামায়াত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই অঞ্চলে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোটের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তাদের ভোট যিনি নিজের পক্ষে নিতে পারবেন তিনিই হাসবেন শেষ হাসি। এ আসনের ভোটাররা কেউ কেউ বলছেন হিলালী নির্যাতিত নেতা, এলাকার উন্নয়নে সংসদে যেতে সুযোগ করে দিতে চান তাকে। আবার কেউ বলছেন দুলাল জনসম্পৃক্ত ব্যক্তি তিনিই হাসবেন শেষ হাসি। আবার কেউ কেউ বলছেন একবার সুযোগ করে দিতে চান জামায়াতকে।
ধানের শীষের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম হিলালী বলেন, আমি দীর্ঘদিন যাবত মাঠে ছিলাম এবং আছি। আমি জনগণের ভালো সাড়া পাচ্ছি। মানুষ এই আসনে শহীদ জিয়া এবং খালেদা জিয়ার প্রতীক ধানের শীষকে বিজয়ী করবে, ইনশাল্লাহ। তিনি বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীকে দলের মাথাব্যথার কারণ হিসেবে দেখছি না। ধানের শীষ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে, ইনশাল্লাহ। বিএনপির বিদ্রোহী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভুঁইয়া জানান, আমি দীর্ঘদিন জনপ্রতিনিধি ছিলাম। মানুষের সাথেই আমার চলাফেরা। মাঠ পর্যায়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এবং মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমি জয়ী হব, ইনশাল্লাহ। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী খাইরুল কবির নিয়োগী জানান, মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। আমরা মাঠ পর্যায়ে ভালো সাড়া পাচ্ছি। জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারলে আমরা জয়ী হব, ইনশাআল্লাহ। সব মিলিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেত্রকোনা-৩ আসনে কার হাতে যাবে জয়, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। আটপাড়া ও কেন্দুয়ার মানুষের প্রধান প্রত্যাশা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান। ফলে এই আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।

