ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
বাংলাদেশ আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। রাজধানী থেকে জেলা–উপজেলা পর্যন্ত সমাবেশ, জনসভা ও রাজনৈতিক বক্তব্যে মুখর হয়ে উঠছে দেশ। গণতন্ত্রের স্বার্থে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মতপ্রকাশ অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় যদি ভাষা ও আচরণে শালীনতার অভাব দেখা দেয়, তাহলে নির্বাচন গণতান্ত্রিক উৎসবের পরিবর্তে উদ্বেগ ও বিভাজনের উপলক্ষে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
রাজনৈতিক সমাবেশ হলো জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এখানেই দলগুলো তাদের দর্শন, পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে। একই সঙ্গে এখান থেকেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপরেখা স্পষ্ট হয়। ফলে সমাবেশের মঞ্চে নেতাদের বক্তব্য কেবল দলীয় সমর্থকদের জন্য নয়—সমগ্র সমাজের জন্য একটি বার্তা বহন করে। এই বাস্তবতা অনুধাবন করেই রাজনৈতিক ভাষা ও আচরণে দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
গণতন্ত্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। ভিন্নমত, সমালোচনা ও বিতর্ক ছাড়া গণতান্ত্রিক চর্চা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন সেই মতভিন্নতার প্রকাশ অশালীন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কটাক্ষমূলক মন্তব্যে রূপ নেয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন চিত্র নতুন নয়। অনেক সময় দেখা যায়, নীতিনির্ভর আলোচনা বা কর্মসূচি তুলে ধরার পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে হেয় করা, বিদ্রূপ করা কিংবা উত্তেজক শব্দচয়নই বক্তৃতার প্রধান উপজীব্য হয়ে ওঠে। এতে রাজনৈতিক লাভ সাময়িক হলেও সামাজিক ক্ষতি হয় দীর্ঘস্থায়ী।
রাজনৈতিক নেতারা সমাজের রোল মডেল। তাঁদের কথা ও আচরণ সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক বক্তব্য থেকেই রাজনীতি সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলে। যখন তারা দেখে, ভিন্নমত মানেই আক্রমণ, যুক্তির বদলে অপশব্দ—তখন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভিন্নমত গ্রহণের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অশনিসংকেত।
শালীন রাজনৈতিক বক্তব্য মানে সত্য গোপন করা বা সমালোচনা বন্ধ করা নয়। বরং শালীনতার অর্থ হলো—যুক্তি, তথ্য ও নীতির আলোকে কথা বলা। কোনো সরকারের ব্যর্থতা, কোনো দলের ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমালোচনা অবশ্যই করা যেতে পারে। কিন্তু তা হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও মার্জিত ভাষায়। ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার বা ব্যক্তিত্বকে আক্রমণ করে রাজনৈতিক লাভ আদায়ের চেষ্টা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রকাশ।
নির্বাচন একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে রাজনৈতিক পরিবেশকে শান্ত ও গ্রহণযোগ্য রাখা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের আগে যদি রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্তেজনা, ঘৃণা বা বিভাজনের সুর ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ভয় কাজ করে। মানুষ তখন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পরিবর্তে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়। এর ফল হিসেবে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে, যা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শীর্ষ নেতারা যদি শালীনতা ও সংযমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তাহলে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরাও তা অনুসরণ করতে বাধ্য হবে। দলীয় শৃঙ্খলার আওতায় অশালীন বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এটি কোনো দলের দুর্বলতা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক।
নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের ভূমিকাও এখানে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আচরণবিধিতে রাজনৈতিক বক্তব্যের শালীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হবে—যাতে রাজনৈতিক সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং কোনো বক্তব্য থেকে সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলার জন্ম না নেয়।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অশালীন বা উত্তেজক বক্তব্যকে অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার না করে, বরং নীতিনির্ভর আলোচনা, বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। গণমাধ্যম চাইলে রাজনৈতিক ভাষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—ভাষার উত্তাপ যখন বেড়েছে, তখনই সংঘাত ও অস্থিরতা তীব্র হয়েছে। আর যখন সংলাপ, সহনশীলতা ও শালীনতার চর্চা হয়েছে, তখন রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত থেকেছে। অতীতের এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জনগণের প্রত্যাশা—তারা তাদের কর্মসূচি, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ দর্শন তুলে ধরবে। দেশ কীভাবে এগোবে, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের বিষয়ে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অশালীন বক্তব্য এসব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাকে আড়াল করে দেয়।
রাজনৈতিক শালীনতা কেবল একটি নৈতিক বিষয় নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজনও বটে। শালীন ভাষা ও যুক্তিনির্ভর বক্তব্যই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে। উত্তেজক ভাষা দিয়ে সাময়িক সমর্থন পাওয়া গেলেও তা টেকসই হয় না।
সবশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের বিষয় নয়; এটি গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার একটি সুযোগ। এই সুযোগকে সফল করতে হলে রাজনৈতিক সমাবেশ ও বক্তব্যে শালীনতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভাষার সংযম, আচরণের দায়িত্বশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাই পারে নির্বাচনকে একটি গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় পরিণত করতে।রাজনীতি হবে মতের লড়াই, যুক্তির প্রতিযোগিতা—কথার কুরুচি নয়। এই বোধ থেকেই রাজনৈতিক সমাবেশের মঞ্চে শালীনতার চর্চা এখন সময়ের দাবি, বরং জাতীয় দায়িত্ব।

